কক্সবাজার ০৩:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১১ মাত্রার রহস্যময় মহাবিশ্বে স্রষ্টার অসীম মহিমা

এম এ বাপ্পি
  • আপডেট সময় ০২:২১:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৭ বার পড়া হয়েছে

অন্ধকার রাতের নির্জন ঘরে আপনি বসে আছেন। হঠাৎ অনুভব করলেন চারপাশের বাতাসটা কেমন যেন থমথমে হয়ে এলো। হঠাৎ ঘরের চারপাশের ইট-পাথরের দেয়ালগুলো সম্পূর্ণ অক্ষত রেখেই শূন্য বাতাস ফুঁড়ে আপনার সামনে এসে দাঁড়ালো এক অদেখা অবয়ব! কোনো দরজা বা জানালা খোলার শব্দ হয়নি, কোনো দেয়ালও ভাঙ্গেনি। আপনার চোখ আর মস্তিষ্ক এমন দৃশ্য দেখে ভয়ে জমে যাবে, মনে হবে সাক্ষাৎ কোনো অলৌকিক সত্তা বা ভূতের মুখোমুখি হয়েছেন আপনি। কিন্তু মহাবিশ্বের নিখুঁত সুতোয় বুনন করা প্রকৃতির নিয়মে এটি কোনো ভেল্কিবাজি বা অলৌকিক কাণ্ড নয়—এটি কেবল মাত্রার বা ডাইমেনশনের অদেখা খেলা!

 

এই রোমাঞ্চকর রহস্যকে বুঝতে কাগজের ওপর হেঁটে চলা একটি ছোট্ট পিঁপড়ার কথা ভাবুন। তার সমগ্র জীবন আর অস্তিত্ব আটকে আছে একটি চ্যাপ্টা বা দ্বিমাত্রিক জগতে। তার কাছে কেবল সামনে-পিছনে আর ডানে-বামে যাওয়ার পথ খোলা আছে; “ওপর” বা “নিচ” বলতে যে অসীম এক অদেখা দিক হতে পারে, তা তার কল্পনাশক্তি ও চিন্তার বহু বাইরে। আপনি যদি ওপর থেকে আপনার একটি আঙুল নামিয়ে তার পথের সামনে রাখেন, পিঁপড়াটার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে মনে হবে শূন্য থেকে হঠাৎ বিশাল এক পাহাড়ের আবির্ভাব হলো! আর আঙুলটি ওপরের দিকে তুলে নিলে তার মনে হবে পাহাড়টি চোখের নিমেষে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। পিঁপড়ার চ্যাপ্টা জগতের দৃষ্টিতে এটি পরম অলৌকিক ও ভৌতিক এক ঘটনা হলেও, আপনার ত্রিমাত্রিক জগতের কাছে তা অতি সাধারণ এক বিষয়। মূল রহস্যটি লুকিয়ে আছে কেবল ডাইমেনশনের পার্থক্যে।

 

আমরা মানুষরা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা নিয়ে তৈরি এক বিশাল ত্রিমাত্রিক সাগরে বাস করি। আমাদের অনেকেরই ধারণা যে এই তিন মাত্রার বাইরের জগৎগুলো বুঝি কোনো সায়েন্স-ফিকশন বা গল্পের কাল্পনিক ছক। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে আমাদের ত্রিমাত্রিক জগতের সাথে পরম সুতোয় বাঁধা ‘সময়’-কে চিহ্নিত করা হয়েছে চতুর্থ মাত্রা হিসেবে—যা সম্পূর্ণ পরীক্ষিত ও বাস্তব এক বৈজ্ঞানিক সত্য। মহাবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বিশ্বকে চমকে দিয়ে দেখিয়েছেন স্থান (Space) আর সময় (Time) আলাদা দুটি উপাদান নয়, বরং এগুলো একে অপরের সাথে মিশে তৈরি করেছে এক অদ্ভুত ‘স্পেস-টাইম ফেব্রিক’। আমরা ত্রিমাত্রিক স্থানের ভেতর ইচ্ছা অনুযায়ী সামনে-পিছনে হাঁটতে পারলেও, সময়ের চতুর্থ মাত্রায় আমরা কেবলি ভবিষ্যতের দিকে একমুখী স্রোতে ভেসে চলা অভিযাত্রী। আমাদের মোবাইল ফোনের জিপিএস নেভিগেশন থেকে শুরু করে মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো কৃত্রিম উপগ্রহ—সবকিছুই এই চতুর্থ মাত্রার অদৃশ্য হাতকে হিসাবের মধ্যে ধরে নিখুঁতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

 

এখন যদি এই স্থান ও সময়ের পাশাপাশি দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার সাথে একদম নব্বই ডিগ্রি সমকোণে লুকিয়ে থাকা আরও একটি অদৃশ্য স্থানিক দিক থাকত, তবে আমাদের সীমিত ইন্দ্রিয় ও মস্তিষ্কের জন্য তা তৈরি করত এক রুদ্ধশ্বাস ও শিহরণজাগানো অভিজ্ঞতা! আমাদের চেনা ত্রিমাত্রিক জগতে চারদিকে চারটা শক্ত দেয়াল তুলে দিলে আপনি বন্দি হয়ে যান, বের হওয়ার কোনো পথ থাকে না। কিন্তু চতুর্মাত্রিক জগতের কোনো সত্তার কাছে আপনার এই শক্তিশালী বন্ধ ঘরটি এক বিশাল খোলা ময়দানের মতো! ঠিক যেমন কাগজের ভেতরের আঁকা ঘরে আটকে থাকা পিঁপড়াটিকে আপনি কাগজের সীমানা না ছুঁয়েই ওপর থেকে অনায়াসে আঙুল দিয়ে তুলে নিয়ে আসতে পারেন, ঠিক তেমনি চতুর্মাত্রিক কোনো সত্তা আমাদের ঘরের দেয়াল স্পর্শ না করেই ওপরের অদেখা পথ দিয়ে সোজা ভেতরে ঢুকে পড়তে পারবে। সে যখন আপনার দিকে তাকাবে, কোনো চামড়া, হাড় বা মাংসের বাধা ছাড়াই আপনার বুকের ভেতরের স্পন্দিত হৃদপিণ্ডটিকে সরাসরি দেখতে পাবে—যা আমাদের ত্রিমাত্রিক কল্পনায় পরম ভৌতিক ও রোমাঞ্চকর এক দৃশ্য।

ঠিক এই বিষ্ময়কর ও রোমাঞ্চকর জায়গা থেকেই আল-কুরআনের মহামান্বিত বাণীগুলোর গভীরে ডুব দেওয়া যায়। কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথে আছেন” কিংবা “আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও অধিক নিকটবর্তী।” আমরা যখন ত্রিমাত্রিক সীমানায় দাঁড়িয়ে চিন্তা করি, তখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে—কীভাবে রব প্রতিটি ক্ষণে সবখানে উপস্থিত থাকতে পারেন? কিন্তু ভেবে দেখুন, দ্বিমাত্রিক কাগজের ভেতরের পিঁপড়াটির পুরো জগত ও অবস্থান যেমন ওপর থেকে আপনার এক পলকের নজরে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত, তেমনি ত্রিমাত্রিক বা উচ্চতর যেকোনো মাত্রায় থাকা আমাদের প্রতিটি অবস্থান, গোপন চিন্তা এবং হৃদস্পন্দন রবের অসীম ক্ষমতা, নিখুঁত দৃষ্টি এবং জ্ঞানের মহাদরিয়ায় চিরকাল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।

 

তবে এর মানে এই নয় যে, মহান সৃষ্টিকর্তা কোনো নির্দিষ্ট ডাইমেনশন বা ভৌগোলিক সীমানায় মানুষের মতো শারীরিক অবয়ব নিয়ে বাস করেন। কুরআনে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, “কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়” এবং “তিনি আরশে সমাসীন।” আলো যেমন নিজের তৈরি করা প্রদীপের কাঁচের ভেতরে বন্দি থাকে না, ঠিক তেমনি স্থান, কাল, সময় এবং এগারোটি ডাইমেনশনের রূপরেখা—এই সবই মহান রবের সৃষ্টি করা নিয়মের অংশ। তিনি কোনো নির্দিষ্ট চতুর্মাত্রিক বা একাদশ-মাত্রিক সীমানায় আবদ্ধ নন; বরং তিনি স্থান ও কালের সমস্ত সৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে মহাবিশ্বের প্রতিটি কণিকায় তাঁর অসীম জ্ঞান, কুদরত ও মহিমায় বিরাজমান।

 

পদার্থবিজ্ঞানের চরম চূড়ায় থাকা ‘এম-থিওরি’ বা স্ট্রিং থিওরিতে মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যে এগারোটি ডাইমেনশনের অবিশ্বাস্য ক্যানভাস আঁকা হয়েছে, তার সূচনা হয় একটি সাধারণ দৈর্ঘ্যের রেখা দিয়ে। এরপর চ্যাপ্টা কাগজের মতো দ্বিতীয় মাত্রা যুক্ত হয়ে ডানে-বামে যাওয়ার পথ খোলে, আর আমাদের ত্রিমাত্রিক জগতে যোগ হয় উচ্চতা ও আয়তন। এর সাথে চতুর্থ মাত্রা ‘সময়’ পুরো জগতকে সামনের দিকে গড়িয়ে নিয়ে চলে। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের মতে, পঞ্চম ও ষষ্ঠ মাত্রায় পা রাখতে পারলে হয়তো আমাদের জীবনের হাজারো বিকল্প সিদ্ধান্ত আর ভিন্ন ভিন্ন সম্ভাবনাময় বিশ্বকে চোখের সামনে দেখতে পাওয়া যেত। আর সপ্তম, অষ্টম ও নবম মাত্রায় অবস্থান করছে এমন সব সমান্তরাল মহাবিশ্ব, যেখানে বিগ ব্যাং-এর সূচনা থেকেই বিজ্ঞানের সব নিয়ম সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে কাজ করে। দশম মাত্রা হলো কল্পনা ও সম্ভাবনার চরম শেষ সীমা, যা এক বিন্দুতে এসে মিশে যায়। আর সবশেষে একাদশ মাত্রায় এসে বিজ্ঞান ধারণা করে যে, পুরো মহাবিশ্ব ও সমস্ত ডাইমেনশন নাকি চরম ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্পন্দিত শক্তির সুতো বা ‘সুপারস্ট্রিং’-এর কম্পনে এক অদেখা মায়াজালে বাঁধা পড়ে আছে!

 

তবে এত যে এগারোটি ডাইমেনশনের রোমাঞ্চকর ও শিহরণ জাগানো গল্প বলা হলো, এর পেছনে লুকিয়ে থাকা সবচেয়ে বড় সত্যটি হলো—আমাদের চেনা তিনটি স্থানিক ডাইমেনশন এবং প্রথম মাত্রা ‘সময়’ ছাড়া এর ওপরের পঞ্চম থেকে একাদশ ডাইমেনশনের একটিও বাস্তবে অস্তিত্বশীল কি না, তা আজ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সরাসরি প্রমাণিত নয়! এগুলো মূলত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতের অত্যন্ত সুবিন্যস্ত গাণিতিক মডেল মাত্র। বিজ্ঞান খাতা-কলমের সমীকরণে এগুলোকে নিখুঁতভাবে মেলাতে পারলেও, কোনো ল্যাবরেটরি বা প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ দিয়ে ত্রিমাত্রিক জগত ও সময়ের বাইরে অন্য কোনো উচ্চতর মাত্রার অস্তিত্ব মানুষ আজ পর্যন্ত বাস্তবে প্রমাণ করতে পারেনি। আর এই অদেখা সীমাহীন রহস্যই চিরকাল সৃষ্টির মাত্রাকে করেছে রোমাঞ্চকর, আর তার মাঝে ফুটিয়ে তুলেছে পরম স্রষ্টার অসীম মহিমা।

 

লেখক: তাশরিফুল ইসলাম

শিশু-কিশোর সংগঠক, কক্সবাজার

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

১১ মাত্রার রহস্যময় মহাবিশ্বে স্রষ্টার অসীম মহিমা

আপডেট সময় ০২:২১:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

অন্ধকার রাতের নির্জন ঘরে আপনি বসে আছেন। হঠাৎ অনুভব করলেন চারপাশের বাতাসটা কেমন যেন থমথমে হয়ে এলো। হঠাৎ ঘরের চারপাশের ইট-পাথরের দেয়ালগুলো সম্পূর্ণ অক্ষত রেখেই শূন্য বাতাস ফুঁড়ে আপনার সামনে এসে দাঁড়ালো এক অদেখা অবয়ব! কোনো দরজা বা জানালা খোলার শব্দ হয়নি, কোনো দেয়ালও ভাঙ্গেনি। আপনার চোখ আর মস্তিষ্ক এমন দৃশ্য দেখে ভয়ে জমে যাবে, মনে হবে সাক্ষাৎ কোনো অলৌকিক সত্তা বা ভূতের মুখোমুখি হয়েছেন আপনি। কিন্তু মহাবিশ্বের নিখুঁত সুতোয় বুনন করা প্রকৃতির নিয়মে এটি কোনো ভেল্কিবাজি বা অলৌকিক কাণ্ড নয়—এটি কেবল মাত্রার বা ডাইমেনশনের অদেখা খেলা!

 

এই রোমাঞ্চকর রহস্যকে বুঝতে কাগজের ওপর হেঁটে চলা একটি ছোট্ট পিঁপড়ার কথা ভাবুন। তার সমগ্র জীবন আর অস্তিত্ব আটকে আছে একটি চ্যাপ্টা বা দ্বিমাত্রিক জগতে। তার কাছে কেবল সামনে-পিছনে আর ডানে-বামে যাওয়ার পথ খোলা আছে; “ওপর” বা “নিচ” বলতে যে অসীম এক অদেখা দিক হতে পারে, তা তার কল্পনাশক্তি ও চিন্তার বহু বাইরে। আপনি যদি ওপর থেকে আপনার একটি আঙুল নামিয়ে তার পথের সামনে রাখেন, পিঁপড়াটার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে মনে হবে শূন্য থেকে হঠাৎ বিশাল এক পাহাড়ের আবির্ভাব হলো! আর আঙুলটি ওপরের দিকে তুলে নিলে তার মনে হবে পাহাড়টি চোখের নিমেষে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। পিঁপড়ার চ্যাপ্টা জগতের দৃষ্টিতে এটি পরম অলৌকিক ও ভৌতিক এক ঘটনা হলেও, আপনার ত্রিমাত্রিক জগতের কাছে তা অতি সাধারণ এক বিষয়। মূল রহস্যটি লুকিয়ে আছে কেবল ডাইমেনশনের পার্থক্যে।

 

আমরা মানুষরা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা নিয়ে তৈরি এক বিশাল ত্রিমাত্রিক সাগরে বাস করি। আমাদের অনেকেরই ধারণা যে এই তিন মাত্রার বাইরের জগৎগুলো বুঝি কোনো সায়েন্স-ফিকশন বা গল্পের কাল্পনিক ছক। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে আমাদের ত্রিমাত্রিক জগতের সাথে পরম সুতোয় বাঁধা ‘সময়’-কে চিহ্নিত করা হয়েছে চতুর্থ মাত্রা হিসেবে—যা সম্পূর্ণ পরীক্ষিত ও বাস্তব এক বৈজ্ঞানিক সত্য। মহাবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বিশ্বকে চমকে দিয়ে দেখিয়েছেন স্থান (Space) আর সময় (Time) আলাদা দুটি উপাদান নয়, বরং এগুলো একে অপরের সাথে মিশে তৈরি করেছে এক অদ্ভুত ‘স্পেস-টাইম ফেব্রিক’। আমরা ত্রিমাত্রিক স্থানের ভেতর ইচ্ছা অনুযায়ী সামনে-পিছনে হাঁটতে পারলেও, সময়ের চতুর্থ মাত্রায় আমরা কেবলি ভবিষ্যতের দিকে একমুখী স্রোতে ভেসে চলা অভিযাত্রী। আমাদের মোবাইল ফোনের জিপিএস নেভিগেশন থেকে শুরু করে মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো কৃত্রিম উপগ্রহ—সবকিছুই এই চতুর্থ মাত্রার অদৃশ্য হাতকে হিসাবের মধ্যে ধরে নিখুঁতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

 

এখন যদি এই স্থান ও সময়ের পাশাপাশি দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার সাথে একদম নব্বই ডিগ্রি সমকোণে লুকিয়ে থাকা আরও একটি অদৃশ্য স্থানিক দিক থাকত, তবে আমাদের সীমিত ইন্দ্রিয় ও মস্তিষ্কের জন্য তা তৈরি করত এক রুদ্ধশ্বাস ও শিহরণজাগানো অভিজ্ঞতা! আমাদের চেনা ত্রিমাত্রিক জগতে চারদিকে চারটা শক্ত দেয়াল তুলে দিলে আপনি বন্দি হয়ে যান, বের হওয়ার কোনো পথ থাকে না। কিন্তু চতুর্মাত্রিক জগতের কোনো সত্তার কাছে আপনার এই শক্তিশালী বন্ধ ঘরটি এক বিশাল খোলা ময়দানের মতো! ঠিক যেমন কাগজের ভেতরের আঁকা ঘরে আটকে থাকা পিঁপড়াটিকে আপনি কাগজের সীমানা না ছুঁয়েই ওপর থেকে অনায়াসে আঙুল দিয়ে তুলে নিয়ে আসতে পারেন, ঠিক তেমনি চতুর্মাত্রিক কোনো সত্তা আমাদের ঘরের দেয়াল স্পর্শ না করেই ওপরের অদেখা পথ দিয়ে সোজা ভেতরে ঢুকে পড়তে পারবে। সে যখন আপনার দিকে তাকাবে, কোনো চামড়া, হাড় বা মাংসের বাধা ছাড়াই আপনার বুকের ভেতরের স্পন্দিত হৃদপিণ্ডটিকে সরাসরি দেখতে পাবে—যা আমাদের ত্রিমাত্রিক কল্পনায় পরম ভৌতিক ও রোমাঞ্চকর এক দৃশ্য।

ঠিক এই বিষ্ময়কর ও রোমাঞ্চকর জায়গা থেকেই আল-কুরআনের মহামান্বিত বাণীগুলোর গভীরে ডুব দেওয়া যায়। কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথে আছেন” কিংবা “আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও অধিক নিকটবর্তী।” আমরা যখন ত্রিমাত্রিক সীমানায় দাঁড়িয়ে চিন্তা করি, তখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে—কীভাবে রব প্রতিটি ক্ষণে সবখানে উপস্থিত থাকতে পারেন? কিন্তু ভেবে দেখুন, দ্বিমাত্রিক কাগজের ভেতরের পিঁপড়াটির পুরো জগত ও অবস্থান যেমন ওপর থেকে আপনার এক পলকের নজরে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত, তেমনি ত্রিমাত্রিক বা উচ্চতর যেকোনো মাত্রায় থাকা আমাদের প্রতিটি অবস্থান, গোপন চিন্তা এবং হৃদস্পন্দন রবের অসীম ক্ষমতা, নিখুঁত দৃষ্টি এবং জ্ঞানের মহাদরিয়ায় চিরকাল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।

 

তবে এর মানে এই নয় যে, মহান সৃষ্টিকর্তা কোনো নির্দিষ্ট ডাইমেনশন বা ভৌগোলিক সীমানায় মানুষের মতো শারীরিক অবয়ব নিয়ে বাস করেন। কুরআনে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, “কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়” এবং “তিনি আরশে সমাসীন।” আলো যেমন নিজের তৈরি করা প্রদীপের কাঁচের ভেতরে বন্দি থাকে না, ঠিক তেমনি স্থান, কাল, সময় এবং এগারোটি ডাইমেনশনের রূপরেখা—এই সবই মহান রবের সৃষ্টি করা নিয়মের অংশ। তিনি কোনো নির্দিষ্ট চতুর্মাত্রিক বা একাদশ-মাত্রিক সীমানায় আবদ্ধ নন; বরং তিনি স্থান ও কালের সমস্ত সৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে মহাবিশ্বের প্রতিটি কণিকায় তাঁর অসীম জ্ঞান, কুদরত ও মহিমায় বিরাজমান।

 

পদার্থবিজ্ঞানের চরম চূড়ায় থাকা ‘এম-থিওরি’ বা স্ট্রিং থিওরিতে মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যে এগারোটি ডাইমেনশনের অবিশ্বাস্য ক্যানভাস আঁকা হয়েছে, তার সূচনা হয় একটি সাধারণ দৈর্ঘ্যের রেখা দিয়ে। এরপর চ্যাপ্টা কাগজের মতো দ্বিতীয় মাত্রা যুক্ত হয়ে ডানে-বামে যাওয়ার পথ খোলে, আর আমাদের ত্রিমাত্রিক জগতে যোগ হয় উচ্চতা ও আয়তন। এর সাথে চতুর্থ মাত্রা ‘সময়’ পুরো জগতকে সামনের দিকে গড়িয়ে নিয়ে চলে। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের মতে, পঞ্চম ও ষষ্ঠ মাত্রায় পা রাখতে পারলে হয়তো আমাদের জীবনের হাজারো বিকল্প সিদ্ধান্ত আর ভিন্ন ভিন্ন সম্ভাবনাময় বিশ্বকে চোখের সামনে দেখতে পাওয়া যেত। আর সপ্তম, অষ্টম ও নবম মাত্রায় অবস্থান করছে এমন সব সমান্তরাল মহাবিশ্ব, যেখানে বিগ ব্যাং-এর সূচনা থেকেই বিজ্ঞানের সব নিয়ম সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে কাজ করে। দশম মাত্রা হলো কল্পনা ও সম্ভাবনার চরম শেষ সীমা, যা এক বিন্দুতে এসে মিশে যায়। আর সবশেষে একাদশ মাত্রায় এসে বিজ্ঞান ধারণা করে যে, পুরো মহাবিশ্ব ও সমস্ত ডাইমেনশন নাকি চরম ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্পন্দিত শক্তির সুতো বা ‘সুপারস্ট্রিং’-এর কম্পনে এক অদেখা মায়াজালে বাঁধা পড়ে আছে!

 

তবে এত যে এগারোটি ডাইমেনশনের রোমাঞ্চকর ও শিহরণ জাগানো গল্প বলা হলো, এর পেছনে লুকিয়ে থাকা সবচেয়ে বড় সত্যটি হলো—আমাদের চেনা তিনটি স্থানিক ডাইমেনশন এবং প্রথম মাত্রা ‘সময়’ ছাড়া এর ওপরের পঞ্চম থেকে একাদশ ডাইমেনশনের একটিও বাস্তবে অস্তিত্বশীল কি না, তা আজ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সরাসরি প্রমাণিত নয়! এগুলো মূলত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতের অত্যন্ত সুবিন্যস্ত গাণিতিক মডেল মাত্র। বিজ্ঞান খাতা-কলমের সমীকরণে এগুলোকে নিখুঁতভাবে মেলাতে পারলেও, কোনো ল্যাবরেটরি বা প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ দিয়ে ত্রিমাত্রিক জগত ও সময়ের বাইরে অন্য কোনো উচ্চতর মাত্রার অস্তিত্ব মানুষ আজ পর্যন্ত বাস্তবে প্রমাণ করতে পারেনি। আর এই অদেখা সীমাহীন রহস্যই চিরকাল সৃষ্টির মাত্রাকে করেছে রোমাঞ্চকর, আর তার মাঝে ফুটিয়ে তুলেছে পরম স্রষ্টার অসীম মহিমা।

 

লেখক: তাশরিফুল ইসলাম

শিশু-কিশোর সংগঠক, কক্সবাজার