মীর জাফর কেন এত ঘৃণিত? ইতিহাসের এক বিতর্কিত চরিত্রের উত্থান ও পতন

- আপডেট সময় ০২:১৭:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
- / ৬৬৭ বার পড়া হয়েছে
মীর জাফর কেন এত ঘৃণিত? ইতিহাসের এক বিতর্কিত চরিত্রের উত্থান ও পতন
শহিদুল ইসলাম শহীদ
বাংলা ইতিহাসে “মীর জাফর” নামটি আজও বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কেউ প্রতারণা বা স্বার্থের জন্য নিজের দেশ, দল কিংবা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাকে প্রায়ই “মীর জাফর” বলে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু কেন তিনি এত ঘৃণিত? ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে উঠে আসে পলাশীর যুদ্ধ, নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন এবং বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের সূচনার এক করুণ অধ্যায়।
কে ছিলেন মীর জাফর?
সৈয়দ মীর জাফর আলী খান (১৬৯১–১৭৬৫) ছিলেন বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি বা বখশী। তিনি দীর্ঘদিন নবাব আলীবর্দী খানের অধীনে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দায়িত্ব পালন করেন। আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব হলে মীর জাফরের সঙ্গে তার দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
পলাশীর যুদ্ধ ও ষড়যন্ত্র
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাহিনীর সঙ্গে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, যুদ্ধের আগে থেকেই মীর জাফর, জগতশেঠ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ব্রিটিশদের সঙ্গে গোপন সমঝোতায় যুক্ত ছিলেন।
চুক্তি অনুযায়ী, সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হলে মীর জাফরকে বাংলার নবাব বানানোর প্রতিশ্রুতি দেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। বিনিময়ে কোম্পানি ও তাদের সহযোগীদের বিপুল পরিমাণ অর্থ, সম্পদ ও বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল।
কেন তাকে বিশ্বাসঘাতক বলা হয়?
পলাশীর যুদ্ধে নবাবের বাহিনীতে প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য থাকলেও মীর জাফরের অধীনস্থ বড় একটি অংশ যুদ্ধের সময় কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকে। ফলে সিরাজউদ্দৌলা পর্যাপ্ত সামরিক সহায়তা পাননি। যুদ্ধের মোড় দ্রুত ইংরেজদের পক্ষে চলে যায় এবং নবাব পরাজিত হন।
ঐতিহাসিকদের মতে, সেনাপ্রধান হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা না নেওয়া এবং পূর্বপরিকল্পিতভাবে ইংরেজদের সঙ্গে সমঝোতা করাই মীর জাফরের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার প্রধান অভিযোগ।
বাংলার নবাব হলেও ক্ষমতা ছিল সীমিত
সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর ১৭৫৭ সালে মীর জাফর বাংলার নবাব হন। তবে তিনি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন শাসক ছিলেন না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাপ ও অর্থনৈতিক দাবির কারণে তার প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে।
কোম্পানির কর্মকর্তারা বিপুল অঙ্কের অর্থ ও সুবিধা দাবি করতে থাকেন। এসব দাবি পূরণ করতে গিয়ে বাংলার কোষাগার সংকটে পড়ে এবং নবাবের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে।
ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি
নবাব হওয়ার কিছুদিন পরই মীর জাফর ব্রিটিশ প্রভাব কমানোর চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি ডাচ (ওলন্দাজ) শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৭৫৯ সালে চুঁচুড়া বা বেদারা যুদ্ধের পটভূমি তৈরি হয়।
ব্রিটিশরা বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৭৬০ সালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে তার জামাতা মীর কাসিমকে নবাব বানানো হয়।
ইতিহাসের বিচারে মীর জাফর
ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন, মীর জাফরের ব্যক্তিগত ক্ষমতালোভ ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাংলার স্বাধীনতার জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়েছিল। তার ভূমিকার ফলে বাংলায় ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ সহজ হয় এবং পরবর্তীতে সমগ্র ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের ভিত্তি তৈরি হয়।
অন্যদিকে কিছু গবেষক মনে করেন, সে সময় বাংলার দরবারে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে জনমনে মীর জাফর আজও বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হিসেবেই পরিচিত।















