পতাকার রাজনীতি : বাংলাদেশের ঘাড়ে `জঙ্গি’ তকমা সেঁটে দেওয়ার আন্তর্জাতিক ফাঁদ

- আপডেট সময় ০২:৪৭:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
- / ২৯৮ বার পড়া হয়েছে
আলী ওসমান শেফায়েত
৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক মানচিত্রে এক বিশাল ওলটপালট হয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে তরুণ সমাজ যে নতুন ভোরের সূচনা করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এই পরিবর্তনের পরশপাথরে যখন নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি হচ্ছে, ঠিক তখনই মিছিল-সমাবেশে কিছু ভিন্নধর্মী পতাকার উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ ও নানামুখী প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে, কালেমা লেখা কালো এবং সাদা পতাকার ব্যবহার নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রে পতাকার প্রতীকী অর্থ অত্যন্ত গভীর। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সাময়িক আবেগ এবং দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতার পার্থক্য বোঝাটা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই সবচেয়ে বেশি জরুরি।
ধর্মপ্রাণ মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশে কালেমা লেখা যেকোনো প্রতীকের প্রতি সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের সহজাত আবেগ বা শ্রদ্ধা থাকাটাই স্বাভাবিক। ধর্মীয় সমাবেশ, ওয়াজ মাহফিল বা তাত্ত্বিক আলোচনায় এর ব্যবহারে কারও কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হচ্ছে তখন, যখন এই পবিত্র প্রতীকগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত কিছু উগ্রবাদী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর (যেমন: দায়েশ বা আইএস) প্রতীকের হুবহু আদলে রাজপথে প্রদর্শন করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সূত্রে স্পষ্ট জানা যাচ্ছে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগপূর্ণ মিছিলের ভেতর হঠাৎ কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যধারী বহিরাগত লোক ঢুকে এই কালো পতাকাগুলো তরুণদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে। একই সাথে, অনলাইনে নিষিদ্ধ ঘোষিত কিছু চরমপন্থী সংগঠন এই ধরনের প্রতীক ব্যবহারের জন্য উসকানি দিচ্ছে এবং তরুণদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এখানেই শেষ নয়, মিছিলে আফগান তালেবানদের অনুসরণে কালেমা লেখা সাদা পতাকার প্রদর্শনও দেখা যাচ্ছে। কেউ ব্যক্তিগতভাবে কোনো আদর্শ পছন্দ করতেই পারেন, কিন্তু যখন এই প্রতীকগুলো সাধারণ মানুষের গণমিছিলে ঢোকানো হয়, তখন তা আন্তর্জাতিক মহলে অত্যন্ত বিপজ্জনক বার্তা পাঠায়।
এই ধরনের পতাকার প্রদর্শন মূলত উগ্রবাদ-বিরোধী তকমাধারী প্রতিবেশী রাষ্ট্র বা সুনির্দিষ্ট কিছু সেক্যুলার গোষ্ঠীর সেই পুরোনো বয়ানকেই সত্য প্রমাণ করতে সাহায্য করে— যা বলে, “বাংলাদেশে উগ্রবাদ বা তালেবানের উত্থান ঘটছে।” তরুণদের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে বাংলাদেশকে একটি ‘জঙ্গি রাষ্ট্র’ হিসেবে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার যে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, এই পতাকাগুলো অজান্তেই সেই এজেন্ডাকে সফল করে তুলছে।
অপরদিকে ইসলামের দোহাই দিয়ে যারা এই পতাকাগুলোকে বাধ্যতামূলক বা জিহাদের একমাত্র প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাদের এই দাবির পেছনে ধর্মীয় ভিত্তির চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই বেশি কাজ করছে।
পবিত্র কুরআন বা সহিহ হাদিসের কোথাও ইসলামের জন্য নির্দিষ্ট কোনো রঙের বা নকশার পতাকা নির্ধারণ করা হয়নি, কিংবা তা সার্বক্ষণিক বহন বা উত্তোলনের কোনো বাধ্যবাধকতাও দেওয়া হয়নি।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে যুদ্ধক্ষেত্রে কেবল সৈন্যদলের পারস্পরিক চেনার সুবিধার্থে সাদা, কালো বা সবুজ রঙের সাধারণ কাপড়ের নিশান ব্যবহার করা হতো, যা ছিল তৎকালীন আরবের যুদ্ধরীতির অংশ। একে কোনো ধর্মীয় চিরন্তন প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।
অতএব, ধর্মের নাম দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক বা উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর আদলের পতাকা প্রদর্শন করা কোনোভাবেই ধর্মীয় কর্তব্য হতে পারে না।
একটি দেশের জাতীয় পতাকা কেবল এক টুকরো কাপড় নয়; এটি লাখো শহীদের রক্ত, অজস্র মায়ের ত্যাগ এবং একটি স্বাধীন জাতির আত্মপরিচয়ের দলিল। বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের—তাঁরা যে ধর্ম, বর্ণ বা মতাদর্শেরই হোন না কেন—ঐক্যের প্রতীক।
লাল-সবুজ পতাকা এ দেশের মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ সবাইকে এক সুতোয় বাঁধে। অন্যদিকে, যেকোনো ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত প্রতীক সমাজকে বিভক্ত ও মেরুকৃত করে ফেলে।
বর্তমান নাজুক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশপ্রেমের জায়গা থেকে কেবল বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও ধারণ করাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত এবং কৌশলগতভাবে বুদ্ধিমানের কাজ।
তরুণ সমাজ যে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে, তাদের কাঁধেই এখন রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দায়িত্ব। কোনো অদৃশ্য শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হওয়া কিংবা আবেগের বশে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশকে হেয় করার মতো কোনো ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ঈমান ও ধর্ম মানুষের অন্তরে এবং কর্মে প্রতিফলিত হয়, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর তৈরি করা পতাকায় নয়। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের তরুণদের একমাত্র প্রতীক হওয়া উচিত লাল-সবুজ, আর একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রক্ষা করা।
লেখক: কলামিস্ট















