কক্সবাজার ০৭:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি: জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন

এমএ বাপ্পি
  • আপডেট সময় ০৭:০৬:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৫
  • / ৮৫৩ বার পড়া হয়েছে

সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি: জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন

বাংলাদেশে সংসদীয় নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর। বিশেষ করে, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation – PR) পদ্ধতির প্রবর্তন নিয়ে বিভিন্ন মহলে জোরদার আলোচনা চলছে। এই পদ্ধতি কি সত্যিই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে, নাকি এর সীমাবদ্ধতাগুলো দেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে? দৈনিক আমার দেশের পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে একটি বিশদ এবং গভীর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত “ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট” (First Past The Post – FPTP) বা আসনভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় যিনি সর্বোচ্চ ভোট পান, তিনিই নির্বাচিত হন। এই পদ্ধতিটি ব্রিটেনের ওয়েস্টমিনস্টার মডেল থেকে উদ্ভূত এবং ঐতিহাসিকভাবে বহু দেশে প্রচলিত। তবে, বাংলাদেশে এর প্রয়োগে বেশ কিছু গভীর সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে:

• প্রতিনিধিত্বের অভাব: এই পদ্ধতিতে প্রায়শই দেখা যায়, একটি দল মোট প্রদত্ত ভোটের একটি ক্ষুদ্র অংশ পেয়েও সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। এর ফলে, বিশাল সংখ্যক ভোটারের আকাঙ্ক্ষা বা রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব অনুপস্থিত থাকে। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ যেমনটি বলেছেন, এই ব্যবস্থায় “অঞ্চলভিত্তিক সংসদ সদস্য মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা, টাকার খেলা ও সন্ত্রাসের গুরুত্ব” অনেক বেশি।

• সহিংসতা ও জালিয়াতি: নির্বাচন পর্যবেক্ষক বদিউল আলম মজুমদার উল্লেখ করেছেন যে, এই পদ্ধতিতে সামান্য ভোটের ব্যবধানেও আসনের ক্ষেত্রে বিরাট পার্থক্য হয়, যা নির্বাচনী এলাকায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, হানাহানি, মারামারি, এবং ভোট জালিয়াতির প্রবণতা বাড়ায়।

• অর্থের প্রভাব: এই ব্যবস্থা ধনী ও প্রভাবশালী প্রার্থীদের জন্য সুবিধাজনক। তারা মনোনয়ন কিনে এবং টাকা খরচ করে সহজেই নির্বাচিত হতে পারে, যেখানে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, যোগ্যতা বা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা অনেক ক্ষেত্রে গৌণ হয়ে যায়। সাবেক সিইসি বিচারপতি মরহুম মোহাম্মদ আবদুর রউফ এর মতে, “মনোনয়ন বাণিজ্যই নির্বাচনী বাণিজ্য এনেছে”, যা এমপিদের চরিত্র নষ্ট করছে।

• স্বৈরাচারী প্রবণতা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল নিজেদের স্বার্থে সংবিধান পরিবর্তন করতে দ্বিধা করে না, যা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে প্রায় স্বৈরাচারী করে তোলার পথ খুলে দেয়। ড. তোফায়েল আহমেদ এর মতো স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে বারবার সতর্ক করেছেন।

• স্থিতিশীলতার অভাব: রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অসহিষ্ণুতা এবং নির্বাচিত সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

মরহুম আকবর আলী খানও তার বইয়ে লিখে গেছেন যে, বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতি বাংলাদেশের জন্য সঠিক নয়, কারণ এর ফলে সংঘর্ষের রাজনীতি তীব্র হচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপন্ন হচ্ছে।

এর বিপরীতে, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) পদ্ধতি প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে, বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোর ৭০ শতাংশে প্রচলিত। এই পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

• ভোটের মূল্যায়ণ: ভোটাররা ব্যক্তি প্রার্থীর পরিবর্তে রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। একটি দল সারাদেশে যত শতাংশ ভোট পাবে, সেই অনুপাতে তারা সংসদে আসন লাভ করবে। যেমন, যদি কোনো দল ৫০% ভোট পায়, তাহলে সংসদের মোট আসনের ৫০% তাদের দখলে আসবে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা ইউনুছ মনে করেন, এতে ভোটারদের ভোটের মূল্যায়ন হয় এবং কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার সুযোগ তৈরি হয়।

• বহু-দলীয় প্রতিনিধিত্ব: এই পদ্ধতিতে ছোট দলগুলোও সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পায়, যা সরকার গঠনকে আরও প্রতিনিধিত্বমূলক করে তোলে। এটি একটি বহু-দলীয় সংসদ এবং জোট সরকার গঠনের দিকে চালিত করে।

• নির্বাচনী অনিয়ম হ্রাস: আসনভিত্তিক তীব্র প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ায় নির্বাচনী অনিয়ম, দুর্নীতি, সহিংসতা এবং পেশী শক্তির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

• ক্ষমতার ভারসাম্য: কোনো দলেরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায়, প্রধানমন্ত্রী বা একক দলের স্বৈরাচারী হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়। এতে করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও বেশি আলোচনা, সমঝোতা এবং জোটের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হয়।

• নির্বাচনী ব্যয় সংকোচন: নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় সামগ্রিকভাবে নির্বাচনী ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

• নারীদের প্রতিনিধিত্ব: নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজন ভিন্নভাবে হবে না। বরং দলগুলো নিজেদের প্রার্থী তালিকা দাখিল করার সময় নারী প্রার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করতে আইনত বাধ্য থাকতে পারে, যা তাদের সরাসরি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।

• উপ-নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস: ব্যক্তিভিত্তিক নির্বাচনের পরিবর্তে দলভিত্তিক হওয়ায় কোনো প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে উপ-নির্বাচনের প্রয়োজন হবে না।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল এবং অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সহ অনেক বিশিষ্টজন এই পদ্ধতির ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেছেন, বিশেষ করে অর্থের ছড়াছড়ি কমানো এবং সংঘর্ষের রাজনীতি কমানোর ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা।

সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে, যা দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে:

• দলভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Party-list PR): এক্ষেত্রে ভোটাররা একটি দলকে ভোট দেন এবং দলগুলো তাদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন পায়। দলগুলো নির্বাচনের আগে থেকেই তাদের প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে (ক্লোজড লিস্ট) অথবা ভোটারদের তালিকা থেকে পছন্দের প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে (ওপেন লিস্ট)। নেদারল্যান্ডস দলভিত্তিক ব্যবস্থার উদাহরণ।

• একক স্থানান্তরযোগ্য ভোট (Single Transferable Vote – STV): এটি একটি প্রার্থী-ভিত্তিক পদ্ধতি যেখানে ভোটাররা প্রার্থীদের পছন্দক্রম অনুযায়ী ভোট দেন। এটি ছোট নির্বাচনী এলাকায় বহু সদস্য নির্বাচনের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্যও তুলনামূলকভাবে অনুকূল।

• মিশ্র সদস্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Mixed-member Proportional – MMP): এটি ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট এবং আনুপাতিক পদ্ধতির একটি সংমিশ্রণ। যেমন, নেপালে নিম্নকক্ষের কিছু আসনে সরাসরি নির্বাচন হয় এবং কিছু আসনে আনুপাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। নিউজিল্যান্ড ও জার্মানিও এই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতি সফলভাবে কার্যকর হলেও, নিখুঁত আনুপাতিকতা খুব কমই অর্জিত হয়। নির্বাচনী থ্রেসহোল্ড (ন্যূনতম ভোট শতাংশ যা একটি দলকে সংসদে প্রবেশ করতে দেয়), ছোট নির্বাচনী এলাকার ব্যবহার, বা সমতলকরণ আসনের অভাবের কারণে আনুপাতিকতায় অসামঞ্জস্য দেখা যেতে পারে। তবে, এটি গেরিম্যান্ডারিং (নির্বাচনী এলাকার সীমা পরিবর্তন করে দলের সুবিধা আদায়) প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।

তবে, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি প্রবর্তনের পথে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান:

• সাংবিধানিক পরিবর্তন: সবচেয়ে বড় এবং মৌলিক চ্যালেঞ্জ হলো, এটি প্রবর্তনের জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন জানিয়েছে, তারা নিজে থেকে এ পদ্ধতির প্রস্তাব দেবে না, বরং রাজনৈতিক দলগুলো প্রস্তাব করলে তারা বিবেচনা করবে।

• রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এই পদ্ধতি নিয়ে এখনো সম্পূর্ণ ঐকমত্য তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণতন্ত্র মঞ্চ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি, এবি পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন এবং গণ অধিকার পরিষদ এই পদ্ধতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এর বিপক্ষে। বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মনে করেন, বিএনপির জনসমর্থন ভাঙার কৌশল হিসেবেই এটি একটি পক্ষ নিয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রচলিত পদ্ধতি বহাল রাখার পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন, কারণ নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা “ফ্যাসিবাদী সরকারকে ঠেকানোর যে প্রচেষ্টা সেটি উল্টোও হয়ে যেতে পারে।”

• জনসচেতনতা: শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক যেমনটি বলেছেন, সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থা চালুর আগে ব্যাপক আলোচনা ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। ভোটারদেরও এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে, কারণ এটি বর্তমান পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রক্রিয়া।

• দুর্বল দলীয় কাঠামো: সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি দলভিত্তিক নির্বাচন হওয়ায়, যদি দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র দুর্বল হয়, তাহলে দলের ভেতরের কোন্দল এবং মনোনয়নের ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে।

• জোট সরকারের চ্যালেঞ্জ: সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে প্রায়শই জোট সরকার গঠিত হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য জোট সরকারের মধ্যে সমঝোতা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি অপরিহার্য, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির সম্ভাবনা
বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ অত্যন্ত তীব্র এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের, সেখানে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। এটি কেবলমাত্র একটি নির্বাচনী পদ্ধতির পরিবর্তন নয়, বরং এটি ক্ষমতা কাঠামোয় একটি মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে, কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব কমিয়ে আনা এবং জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সুস্থ ধারার সূচনা করতে পারে।

অসাংবিধানিক পন্থায় সরকার পতনের দীর্ঘ ইতিহাস এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রেক্ষাপটে, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি একটি স্থিতিশীল ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। এই পদ্ধতি প্রবর্তিত হলে দলগুলো আরও বেশি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা করতে বাধ্য হবে, যা সামগ্রিকভাবে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশে অবদান রাখবে। এটি ‘জনগণের সরকার’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে ১০০% ভোটার, সংখ্যা যদি ৮ কোটিও হয়, তাদের সবাই সংসদের অভ্যন্তরে প্রতিনিধিত্বপ্রাপ্ত হবেন।

সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি প্রবর্তন বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হতে পারে। এটি শুধুমাত্র নির্বাচনী অনিয়ম, দুর্নীতি ও সহিংসতা হ্রাস করবে না, বরং সংসদে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে একটি জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনেও সহায়তা করবে। যদিও সংবিধান সংশোধন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির স্বার্থে এই আলোচনার আরও গভীর হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত, নিজেদের সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার নিয়ে এক টেবিলে বসা। এই পদ্ধতি কি সত্যিই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে আরও উজ্জ্বল করতে পারবে, নাকি এটি কেবলই একটি অকার্যকর বিতর্ক হয়ে থাকবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে, একটি বিষয় পরিষ্কার: বাংলাদেশের জনগণ এখন একটি কার্যকর এবং প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য মুখিয়ে আছে।

আলী ওসমান শেফায়েত
লেখক ও কলামিস্ট

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি: জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন

আপডেট সময় ০৭:০৬:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৫

সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি: জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন

বাংলাদেশে সংসদীয় নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর। বিশেষ করে, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation – PR) পদ্ধতির প্রবর্তন নিয়ে বিভিন্ন মহলে জোরদার আলোচনা চলছে। এই পদ্ধতি কি সত্যিই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে, নাকি এর সীমাবদ্ধতাগুলো দেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে? দৈনিক আমার দেশের পাঠকদের জন্য এই বিষয়ে একটি বিশদ এবং গভীর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত “ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট” (First Past The Post – FPTP) বা আসনভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় যিনি সর্বোচ্চ ভোট পান, তিনিই নির্বাচিত হন। এই পদ্ধতিটি ব্রিটেনের ওয়েস্টমিনস্টার মডেল থেকে উদ্ভূত এবং ঐতিহাসিকভাবে বহু দেশে প্রচলিত। তবে, বাংলাদেশে এর প্রয়োগে বেশ কিছু গভীর সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে:

• প্রতিনিধিত্বের অভাব: এই পদ্ধতিতে প্রায়শই দেখা যায়, একটি দল মোট প্রদত্ত ভোটের একটি ক্ষুদ্র অংশ পেয়েও সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। এর ফলে, বিশাল সংখ্যক ভোটারের আকাঙ্ক্ষা বা রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব অনুপস্থিত থাকে। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ যেমনটি বলেছেন, এই ব্যবস্থায় “অঞ্চলভিত্তিক সংসদ সদস্য মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা, টাকার খেলা ও সন্ত্রাসের গুরুত্ব” অনেক বেশি।

• সহিংসতা ও জালিয়াতি: নির্বাচন পর্যবেক্ষক বদিউল আলম মজুমদার উল্লেখ করেছেন যে, এই পদ্ধতিতে সামান্য ভোটের ব্যবধানেও আসনের ক্ষেত্রে বিরাট পার্থক্য হয়, যা নির্বাচনী এলাকায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, হানাহানি, মারামারি, এবং ভোট জালিয়াতির প্রবণতা বাড়ায়।

• অর্থের প্রভাব: এই ব্যবস্থা ধনী ও প্রভাবশালী প্রার্থীদের জন্য সুবিধাজনক। তারা মনোনয়ন কিনে এবং টাকা খরচ করে সহজেই নির্বাচিত হতে পারে, যেখানে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, যোগ্যতা বা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা অনেক ক্ষেত্রে গৌণ হয়ে যায়। সাবেক সিইসি বিচারপতি মরহুম মোহাম্মদ আবদুর রউফ এর মতে, “মনোনয়ন বাণিজ্যই নির্বাচনী বাণিজ্য এনেছে”, যা এমপিদের চরিত্র নষ্ট করছে।

• স্বৈরাচারী প্রবণতা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল নিজেদের স্বার্থে সংবিধান পরিবর্তন করতে দ্বিধা করে না, যা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে প্রায় স্বৈরাচারী করে তোলার পথ খুলে দেয়। ড. তোফায়েল আহমেদ এর মতো স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে বারবার সতর্ক করেছেন।

• স্থিতিশীলতার অভাব: রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অসহিষ্ণুতা এবং নির্বাচিত সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

মরহুম আকবর আলী খানও তার বইয়ে লিখে গেছেন যে, বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতি বাংলাদেশের জন্য সঠিক নয়, কারণ এর ফলে সংঘর্ষের রাজনীতি তীব্র হচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপন্ন হচ্ছে।

এর বিপরীতে, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) পদ্ধতি প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে, বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোর ৭০ শতাংশে প্রচলিত। এই পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

• ভোটের মূল্যায়ণ: ভোটাররা ব্যক্তি প্রার্থীর পরিবর্তে রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। একটি দল সারাদেশে যত শতাংশ ভোট পাবে, সেই অনুপাতে তারা সংসদে আসন লাভ করবে। যেমন, যদি কোনো দল ৫০% ভোট পায়, তাহলে সংসদের মোট আসনের ৫০% তাদের দখলে আসবে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা ইউনুছ মনে করেন, এতে ভোটারদের ভোটের মূল্যায়ন হয় এবং কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার সুযোগ তৈরি হয়।

• বহু-দলীয় প্রতিনিধিত্ব: এই পদ্ধতিতে ছোট দলগুলোও সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পায়, যা সরকার গঠনকে আরও প্রতিনিধিত্বমূলক করে তোলে। এটি একটি বহু-দলীয় সংসদ এবং জোট সরকার গঠনের দিকে চালিত করে।

• নির্বাচনী অনিয়ম হ্রাস: আসনভিত্তিক তীব্র প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ায় নির্বাচনী অনিয়ম, দুর্নীতি, সহিংসতা এবং পেশী শক্তির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

• ক্ষমতার ভারসাম্য: কোনো দলেরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায়, প্রধানমন্ত্রী বা একক দলের স্বৈরাচারী হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়। এতে করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও বেশি আলোচনা, সমঝোতা এবং জোটের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হয়।

• নির্বাচনী ব্যয় সংকোচন: নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় সামগ্রিকভাবে নির্বাচনী ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

• নারীদের প্রতিনিধিত্ব: নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজন ভিন্নভাবে হবে না। বরং দলগুলো নিজেদের প্রার্থী তালিকা দাখিল করার সময় নারী প্রার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করতে আইনত বাধ্য থাকতে পারে, যা তাদের সরাসরি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।

• উপ-নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস: ব্যক্তিভিত্তিক নির্বাচনের পরিবর্তে দলভিত্তিক হওয়ায় কোনো প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে উপ-নির্বাচনের প্রয়োজন হবে না।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল এবং অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সহ অনেক বিশিষ্টজন এই পদ্ধতির ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেছেন, বিশেষ করে অর্থের ছড়াছড়ি কমানো এবং সংঘর্ষের রাজনীতি কমানোর ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা।

সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে, যা দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে:

• দলভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Party-list PR): এক্ষেত্রে ভোটাররা একটি দলকে ভোট দেন এবং দলগুলো তাদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন পায়। দলগুলো নির্বাচনের আগে থেকেই তাদের প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে (ক্লোজড লিস্ট) অথবা ভোটারদের তালিকা থেকে পছন্দের প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে (ওপেন লিস্ট)। নেদারল্যান্ডস দলভিত্তিক ব্যবস্থার উদাহরণ।

• একক স্থানান্তরযোগ্য ভোট (Single Transferable Vote – STV): এটি একটি প্রার্থী-ভিত্তিক পদ্ধতি যেখানে ভোটাররা প্রার্থীদের পছন্দক্রম অনুযায়ী ভোট দেন। এটি ছোট নির্বাচনী এলাকায় বহু সদস্য নির্বাচনের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্যও তুলনামূলকভাবে অনুকূল।

• মিশ্র সদস্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Mixed-member Proportional – MMP): এটি ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট এবং আনুপাতিক পদ্ধতির একটি সংমিশ্রণ। যেমন, নেপালে নিম্নকক্ষের কিছু আসনে সরাসরি নির্বাচন হয় এবং কিছু আসনে আনুপাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। নিউজিল্যান্ড ও জার্মানিও এই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতি সফলভাবে কার্যকর হলেও, নিখুঁত আনুপাতিকতা খুব কমই অর্জিত হয়। নির্বাচনী থ্রেসহোল্ড (ন্যূনতম ভোট শতাংশ যা একটি দলকে সংসদে প্রবেশ করতে দেয়), ছোট নির্বাচনী এলাকার ব্যবহার, বা সমতলকরণ আসনের অভাবের কারণে আনুপাতিকতায় অসামঞ্জস্য দেখা যেতে পারে। তবে, এটি গেরিম্যান্ডারিং (নির্বাচনী এলাকার সীমা পরিবর্তন করে দলের সুবিধা আদায়) প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।

তবে, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি প্রবর্তনের পথে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান:

• সাংবিধানিক পরিবর্তন: সবচেয়ে বড় এবং মৌলিক চ্যালেঞ্জ হলো, এটি প্রবর্তনের জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন জানিয়েছে, তারা নিজে থেকে এ পদ্ধতির প্রস্তাব দেবে না, বরং রাজনৈতিক দলগুলো প্রস্তাব করলে তারা বিবেচনা করবে।

• রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এই পদ্ধতি নিয়ে এখনো সম্পূর্ণ ঐকমত্য তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণতন্ত্র মঞ্চ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি, এবি পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন এবং গণ অধিকার পরিষদ এই পদ্ধতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এর বিপক্ষে। বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মনে করেন, বিএনপির জনসমর্থন ভাঙার কৌশল হিসেবেই এটি একটি পক্ষ নিয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রচলিত পদ্ধতি বহাল রাখার পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন, কারণ নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা “ফ্যাসিবাদী সরকারকে ঠেকানোর যে প্রচেষ্টা সেটি উল্টোও হয়ে যেতে পারে।”

• জনসচেতনতা: শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক যেমনটি বলেছেন, সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থা চালুর আগে ব্যাপক আলোচনা ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। ভোটারদেরও এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে, কারণ এটি বর্তমান পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রক্রিয়া।

• দুর্বল দলীয় কাঠামো: সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি দলভিত্তিক নির্বাচন হওয়ায়, যদি দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র দুর্বল হয়, তাহলে দলের ভেতরের কোন্দল এবং মনোনয়নের ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে।

• জোট সরকারের চ্যালেঞ্জ: সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে প্রায়শই জোট সরকার গঠিত হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য জোট সরকারের মধ্যে সমঝোতা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি অপরিহার্য, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির সম্ভাবনা
বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ অত্যন্ত তীব্র এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের, সেখানে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। এটি কেবলমাত্র একটি নির্বাচনী পদ্ধতির পরিবর্তন নয়, বরং এটি ক্ষমতা কাঠামোয় একটি মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে, কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব কমিয়ে আনা এবং জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সুস্থ ধারার সূচনা করতে পারে।

অসাংবিধানিক পন্থায় সরকার পতনের দীর্ঘ ইতিহাস এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রেক্ষাপটে, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি একটি স্থিতিশীল ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। এই পদ্ধতি প্রবর্তিত হলে দলগুলো আরও বেশি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা করতে বাধ্য হবে, যা সামগ্রিকভাবে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশে অবদান রাখবে। এটি ‘জনগণের সরকার’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে ১০০% ভোটার, সংখ্যা যদি ৮ কোটিও হয়, তাদের সবাই সংসদের অভ্যন্তরে প্রতিনিধিত্বপ্রাপ্ত হবেন।

সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি প্রবর্তন বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হতে পারে। এটি শুধুমাত্র নির্বাচনী অনিয়ম, দুর্নীতি ও সহিংসতা হ্রাস করবে না, বরং সংসদে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে একটি জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনেও সহায়তা করবে। যদিও সংবিধান সংশোধন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির স্বার্থে এই আলোচনার আরও গভীর হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত, নিজেদের সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার নিয়ে এক টেবিলে বসা। এই পদ্ধতি কি সত্যিই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে আরও উজ্জ্বল করতে পারবে, নাকি এটি কেবলই একটি অকার্যকর বিতর্ক হয়ে থাকবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে, একটি বিষয় পরিষ্কার: বাংলাদেশের জনগণ এখন একটি কার্যকর এবং প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য মুখিয়ে আছে।

আলী ওসমান শেফায়েত
লেখক ও কলামিস্ট