কক্সবাজার ০৬:০৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
অরক্ষিত সাগরদ্বীপ কুতুবদিয়া বিলীন হতে চলছে --

৩৫ বছরেও হয়নি টেকসই বেড়িবাঁধ: হুমায়ুন সিকদার

নিজস্ব সংবাদদাতা :
  • আপডেট সময় ০৭:৫০:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
  • / ৩৮৩ বার পড়া হয়েছে

কুতুবদিয়া সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভাঙন ও অব্যবস্থাপনায় এক সময়ের ৬৭ কিলোমিটার বিস্তৃত কুতুবদিয়া এখন সঙ্কুচিত হয়ে প্রায় ২৭ কিলোমিটারে এসে ঠেকেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। টেকসই সুপার ডাইকে বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হলে অদূর ভবিষ্যতে দ্বীপটি বিলীনের আশঙ্কা করছেন তারা।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কুতুবদিয়া রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে আধুনিক ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কুতুবদিয়া বিলীন হলে মাতারবাড়ি, ধলঘাটা, মগনামা, রাজাখালী ও উজানটিয়া এলাকাও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

দ্বীপবাসীরা জানান, বর্ষা মৌসুম এলেই আতঙ্কে দিন কাটে তাদের। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে দ্বীপের অর্ধেকেরও বেশি এলাকা সাগরে বিলীন হয়েছে। জীবিকার তাগিদে বহু মানুষ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বসতি গড়েছেন।

প্রতি বছর ২৯ এপ্রিল এলেই সেই ভয়াল স্মৃতি ফিরে আসে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে ধুরুং ঘাট থেকে ছনুয়া পর্যন্ত সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, এ রুটে সেতু নির্মাণ হলে যোগাযোগ, অর্থনীতি ও জনজীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।

 

সাগরবেষ্টিত দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রতি বছরই জোয়ার-ভাটা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ভাঙছে উপকূল। ৯১ সালের ঘুর্ণিঝড়ের ৩৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো নির্মিত হয়নি স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ। ফলে প্রতিনিয়ত সাগরে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও লবণ মাঠ।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, গত বছরে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একাধিক লঘুচাপ, নিম্নচাপ এবং উচ্চ জোয়ারের ধাক্কায় আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের তাবলেরচর, কাহারপাড়া, ষাইটপাড়া, বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, হায়দারপাড়া, তেলিপাড়া ও আনিছের ডেইল গ্রামের পশ্চিম পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্মিত প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। এতে কয়েকশ ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং ৩০টির বেশি বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, অধিকাংশ ঘর ছিল বাঁশ-কাঠ ও পলিথিনের ছাউনিযুক্ত। শত শত একর ফসলি জমি ও লবণ মাঠ লোনাপানিতে একাকার। এতে স্থানীয়দের জীবিকা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।

কৈয়ারবিল ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর বলেন, “ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে হাজি মফজল ও মৌলভিপাড়া এলাকায় বিলীন হওয়া প্রায় ৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আর নির্মাণ হয়নি। ফলে ৪৫০টি পরিবার ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা বাঁধের পাশে বসবাস করছে। এ এলাকায় কোনো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রও নেই।”

পাউবোর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক উচ্চ জোয়ারের ধাক্কায় আলী আকবর ডেইল, কৈয়ারবিল, দক্ষিণ ধুরুং দ ইউনিয়নের ২০ থেকে ২৫টি অংশে প্রায় এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার বাঁধ। বর্তমানে দ্বীপ উপজেলার চারপাশে প্রায় ৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে, যার অধিকাংশ পাকিস্তান আমলে নির্মিত এবং উচ্চতা মাত্র ১০ থেকে ১২ ফুট।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘনঘন দুর্যোগের কারণে পুরোনো বেড়িবাঁধ আর কার্যকর থাকছে না। তাই জরুরি ভিত্তিতে আধুনিক ও উচ্চমানের সুপার ডাইক নির্মাণ ছাড়া কুতুবদিয়াকে রক্ষা করা কঠিন।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ১৮৭২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত পাঁচটি বড় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়ার অন্তত ২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ বিলীন হয় এবং প্রাণ হারান প্রায় ২৫ হাজার মানুষ।

১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের খুদিয়ারটেক ও রাজাখালী নামে দুটি মৌজা মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যায়। ওই দুই মৌজার প্রায় ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দশক আগে কুতুবদিয়ার আয়তন ছিল প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার। ভাঙতে ভাঙতে এখন তা কমে প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে।

বর্তমানে দ্বীপের

এলাকাবাসীর দাবি, কুতুবদিয়াকে রক্ষায় দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না নিলে একদিন পুরো দ্বীপই সাগরে হারিয়ে যেতে পারে। জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার।

পাউবো সূত্র জানায়, কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের মিরসরাই এবং ফেনী থেকে নোয়াখালীর রহমতখালী পর্যন্ত ৬৪২ কিলোমিটার উপকূল সুরক্ষায় সুপার ডাইক নির্মাণের একটি বৃহৎ প্রকল্প রয়েছে। তবে বিপুল ব্যয়ের এ প্রকল্প এখনো বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তায় রয়েছে। কুতুবদিয়া অংশে ৬৩ কিলোমিটার সুপার ডাইক নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

অরক্ষিত সাগরদ্বীপ কুতুবদিয়া বিলীন হতে চলছে --

৩৫ বছরেও হয়নি টেকসই বেড়িবাঁধ: হুমায়ুন সিকদার

আপডেট সময় ০৭:৫০:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

কুতুবদিয়া সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভাঙন ও অব্যবস্থাপনায় এক সময়ের ৬৭ কিলোমিটার বিস্তৃত কুতুবদিয়া এখন সঙ্কুচিত হয়ে প্রায় ২৭ কিলোমিটারে এসে ঠেকেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। টেকসই সুপার ডাইকে বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হলে অদূর ভবিষ্যতে দ্বীপটি বিলীনের আশঙ্কা করছেন তারা।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কুতুবদিয়া রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে আধুনিক ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কুতুবদিয়া বিলীন হলে মাতারবাড়ি, ধলঘাটা, মগনামা, রাজাখালী ও উজানটিয়া এলাকাও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

দ্বীপবাসীরা জানান, বর্ষা মৌসুম এলেই আতঙ্কে দিন কাটে তাদের। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে দ্বীপের অর্ধেকেরও বেশি এলাকা সাগরে বিলীন হয়েছে। জীবিকার তাগিদে বহু মানুষ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বসতি গড়েছেন।

প্রতি বছর ২৯ এপ্রিল এলেই সেই ভয়াল স্মৃতি ফিরে আসে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে ধুরুং ঘাট থেকে ছনুয়া পর্যন্ত সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, এ রুটে সেতু নির্মাণ হলে যোগাযোগ, অর্থনীতি ও জনজীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।

 

সাগরবেষ্টিত দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রতি বছরই জোয়ার-ভাটা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ভাঙছে উপকূল। ৯১ সালের ঘুর্ণিঝড়ের ৩৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো নির্মিত হয়নি স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ। ফলে প্রতিনিয়ত সাগরে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও লবণ মাঠ।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, গত বছরে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একাধিক লঘুচাপ, নিম্নচাপ এবং উচ্চ জোয়ারের ধাক্কায় আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের তাবলেরচর, কাহারপাড়া, ষাইটপাড়া, বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, হায়দারপাড়া, তেলিপাড়া ও আনিছের ডেইল গ্রামের পশ্চিম পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্মিত প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। এতে কয়েকশ ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং ৩০টির বেশি বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, অধিকাংশ ঘর ছিল বাঁশ-কাঠ ও পলিথিনের ছাউনিযুক্ত। শত শত একর ফসলি জমি ও লবণ মাঠ লোনাপানিতে একাকার। এতে স্থানীয়দের জীবিকা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।

কৈয়ারবিল ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর বলেন, “ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে হাজি মফজল ও মৌলভিপাড়া এলাকায় বিলীন হওয়া প্রায় ৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আর নির্মাণ হয়নি। ফলে ৪৫০টি পরিবার ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা বাঁধের পাশে বসবাস করছে। এ এলাকায় কোনো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রও নেই।”

পাউবোর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক উচ্চ জোয়ারের ধাক্কায় আলী আকবর ডেইল, কৈয়ারবিল, দক্ষিণ ধুরুং দ ইউনিয়নের ২০ থেকে ২৫টি অংশে প্রায় এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার বাঁধ। বর্তমানে দ্বীপ উপজেলার চারপাশে প্রায় ৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে, যার অধিকাংশ পাকিস্তান আমলে নির্মিত এবং উচ্চতা মাত্র ১০ থেকে ১২ ফুট।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘনঘন দুর্যোগের কারণে পুরোনো বেড়িবাঁধ আর কার্যকর থাকছে না। তাই জরুরি ভিত্তিতে আধুনিক ও উচ্চমানের সুপার ডাইক নির্মাণ ছাড়া কুতুবদিয়াকে রক্ষা করা কঠিন।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ১৮৭২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত পাঁচটি বড় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়ার অন্তত ২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ বিলীন হয় এবং প্রাণ হারান প্রায় ২৫ হাজার মানুষ।

১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের খুদিয়ারটেক ও রাজাখালী নামে দুটি মৌজা মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যায়। ওই দুই মৌজার প্রায় ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দশক আগে কুতুবদিয়ার আয়তন ছিল প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার। ভাঙতে ভাঙতে এখন তা কমে প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে।

বর্তমানে দ্বীপের

এলাকাবাসীর দাবি, কুতুবদিয়াকে রক্ষায় দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না নিলে একদিন পুরো দ্বীপই সাগরে হারিয়ে যেতে পারে। জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার।

পাউবো সূত্র জানায়, কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের মিরসরাই এবং ফেনী থেকে নোয়াখালীর রহমতখালী পর্যন্ত ৬৪২ কিলোমিটার উপকূল সুরক্ষায় সুপার ডাইক নির্মাণের একটি বৃহৎ প্রকল্প রয়েছে। তবে বিপুল ব্যয়ের এ প্রকল্প এখনো বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তায় রয়েছে। কুতুবদিয়া অংশে ৬৩ কিলোমিটার সুপার ডাইক নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।