আলী ওসমান শেফায়েতের কলাম
প্রকাশ্যে নারী হেনস্তা: ক্ষমতা নয়, ঔদ্ধত্যের বহিঃপ্রকাশ

- আপডেট সময় ১০:০৬:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫
- / ৪৫১ বার পড়া হয়েছে
সম্প্রতি ভোলার লালমোহন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আমজাদ খান জুলহাস কর্তৃক দ্বীনদার মহিলাদের প্রকাশ্যে টিজিং ও হেনস্তার যে ঘটনা সামনে এসেছে, তা কেবল একজন ব্যক্তির কুরুচিপূর্ণ কাজ নয়, বরং এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এটি চরম আপত্তিকর এবং ফৌজদারী অপরাধের শামিল।
আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করছি, নিজেদের রাজনৈতিক অযোগ্যতা, অদক্ষতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতা ঢাকতে একটি পক্ষ এখন রাস্তার মহিলাদের ‘সিন্ডিকেট অপমানে’ নেমেছে। বিশেষ করে, যখন কোনো রাজনৈতিক দল বিগত ফ্যাসিস্ট ক্ষমতাসীনদের ‘অপসংস্কৃতি’ দূর করার কথা বলে, তখন তাদের কর্মীদের পক্ষ থেকে এমন ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ড সেই দলের আদর্শ ও লক্ষ্যের প্রতি প্রশ্ন তোলে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা শাখার একটি মিটিং শেষে বাড়ি ফেরা বোরকা পরিহিতা নারীদের উদ্দেশ্য করে বিনা অনুমতিতে ভিডিও ধারণ করা, ভিডিও ধারণে বারণ করলে উল্টা চাপ সৃষ্টি করা, ‘কত টাকা দিছে’ বলে অর্থের বিনিময়ে রাজনীতিতে আসার ইঙ্গিত করা, ব্যক্তিগত ঠিকানা ও স্বামীর নাম জানতে চাওয়া, ‘আপনারা কিসের ধর্ম করেন’ বলে ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা, ‘আপনাদের দেখে তো অন্যদের ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে’ বলে অপমানসূচক সম্বোধন করা এবং ভয় দেখাতে ‘আপনারা আগে লীগ করতেন’ বলে চাপ দেওয়া—এগুলো কোনো সুস্থ মানসিকতার মানুষের কাজ হতে পারে না। এটি স্পষ্টতই নারীদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের স্বাধীন ও নিরাপদ বিচরণকে হুমকির মুখে ফেলার এক জঘন্য অপচেষ্টা।
রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, আদর্শের সংঘাতও স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সংঘাত যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে দমাতে নিরীহ মহিলাদের ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ, অপমান ও হেনস্তার মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তখন তা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। একটি মায়ের হাত ধরে যখন শিশু পথে চলে, তখন সেই মাকে রাস্তায় এভাবে অপমান করলে কোনোদিনই দলীয় আদর্শে মানুষ আগ্রহী হবে না।
আপনারা ভুলে যাচ্ছেন, যে মহিলাদের আপনারা টিজিং করছেন, তারা যোগ্যতা, দক্ষতা ও সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতায় হয়তো অনেক অগ্রসর। বিগত ফ্যাসিস্ট ক্ষমতাসীন দলের জুলুম-নির্যাতনের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই তারা রাস্তায় নামে। আর আপনাদের কর্মী রাস্তায় নেমেছেন কেবল নেতাকে খুশী করতে এবং প্রতিপক্ষকে অপদস্থ করতে—এই দুই লক্ষ্যের মধ্যে আসমান-জমিন ব্যবধান। এমন হীন কর্মকাণ্ড কখনোই সফলতা আনতে পারে না। উল্টো, এসব কর্মী হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।
অতএব, আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই: নারী হেনস্তা কোনো রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে না।
ভোলার লালমোহন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা জুলহাসের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ কোনোভাবেই সহ্য করার মতো নয়। আমরা মনে করি, এই জঘন্য কাজের জন্য অবিলম্বে তার দল, অর্থাৎ বিএনপি’র উচিত তাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা। একই সাথে, দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সকল কর্মীদের প্রতি স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করা উচিত যে, এমন নারী হেনস্তামূলক, উসকানিমূলক এবং ফৌজদারী অপরাধের সমতুল্য কর্মকাণ্ড যেন আর না ঘটে।
যে সংস্কৃতি বিগত ফ্যাসিস্ট ক্ষমতাসীন দলের ‘নজির’ হয়ে আছে, তা থেকে শিক্ষা না নিয়ে যদি অন্যান্য দলও একই পথে হাঁটে, তবে রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে। দলমত নির্বিশেষে সকল নারীকে সম্মান করা এবং তাদের নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করা প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মী ও নেতার নৈতিক দায়িত্ব। এই কালচার দ্রুত বন্ধ না হলে এর বিষাক্ত প্রভাব পুরো সমাজকে গ্রাস করবে। ভয়ের রাজত্ব কায়েম করার দিন শেষ। এই সহজ সত্যটি রাজনৈতিক কর্মীদের বুঝতে হবে।

















