কক্সবাজার ০৩:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বলীর মাঠে সুনাম, নদীতে ড্রেজার! ইজারাহীন বালু উত্তোলন দিদার বলির

নিজস্ব সংবাদদাতা :
  • আপডেট সময় ০২:৪৩:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ নভেম্বর ২০২৬
  • / ১৭ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলা ও কক্সবাজারের ডিসি সাহেবের বলীখেলায় একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে সুনাম অর্জন করেছেন কুস্তিগীর দিদার বলি। তবে এবার বলীখেলার মাঠের সাফল্যের বাইরে এসে নানা অভিযোগে স্থানীয়দের সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের উমখালী এলাকায় বাঁকখালী নদীতে ড্রেজার বসিয়ে ইজারা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

 

দিদারুল আলম, যিনি স্থানীয়ভাবে দিদার বলি নামে পরিচিত। বলীখেলার মাঠে একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরিচিতি পাওয়া এই কুস্তিগীরের বিরুদ্ধে এখন নদীর বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।

 

এর আগেও মাদকসংক্রান্ত ঘটনায় আলোচনায় এসেছিলেন দিদার বলি। ২০১৮ সালের ২৮ জুন ময়মনসিংহে দুই বন্ধুসহ ২০০ পিস ইয়াবাসহ আটক হন তিনি। এ ঘটনায় ১১ দিন কারাভোগ করেন বলে জানা গেছে। প্রথম আলোর প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা যায়, মাদকসংক্রান্ত অভিযোগের কারণে ২০১৫ সালের ৩ ও ৪ মে কক্সবাজার শহরের বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী ডিসি সাহেবের বলীখেলায় দিদার বলিকে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

 

বর্তমানে তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ, ইজারা ছাড়াই বাঁকখালী নদী থেকে বাণিজ্যিকভাবে বালু উত্তোলন।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, দক্ষিণ মিঠাছড়ির উমখালী পয়েন্টে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দিন-রাত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব বালু ট্রাক ও ডাম্পারযোগে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য করা হচ্ছে। অথচ এ বালু উত্তোলনের জন্য বৈধ ইজারা বা অনুমোদন রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

 

অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযানও হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৪ জুন তৎকালীন রামুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাজ্জাদ জাহিদ রাতুলের নেতৃত্বে ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় ঘটনাস্থল থেকে দিদার বলির দুই সহযোগীকে আটক করা হয়। পরে তাদের মধ্যে একজনকে ৭ দিন এবং অপরজনকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

 

এ সময় জব্দ করা স্ক্যাভেটরটি স্পট নিলামের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫২ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। ভ্যাট ও আয়করসহ এর মোট মূল্য দাঁড়ায় ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। জব্দ করা বালুও স্পট নিলামে বিক্রি করা হয়।

 

তবে প্রশাসনের এমন অভিযানের পরও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, প্রশাসনের অভিযান ও জরিমানার পরও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় নদী থেকে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে।

 

স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, দিদার বলি এলাকার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয় বলে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। এ কারণে অনেকেই তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে রাজি হন না। আমরা চাই, প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করুক এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক।

 

স্থানীয়দের আশঙ্কা, অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে আশপাশের ফসলি জমি, বসতভিটা ও নদীর তীরবর্তী বাঁধ মারাত্মক ভাঙনঝুঁকিতে পড়ছে। পাশাপাশি ভারী যানবাহনে বালু পরিবহনের কারণে গ্রামের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

 

পরিবেশসংশ্লিষ্টদের মতে, নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ ও স্বাভাবিক প্রবাহের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এর প্রভাবে নদীভাঙন, কৃষিজমি ও বসতভিটার ক্ষতিসহ দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকে।

 

এ বিষয়ে অভিযুক্ত দিদার বলির বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে খুদে বার্তা পাঠিয়ে তার বক্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

 

অন্যদিকে, এ বিষয়ে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

 

নদী ও পরিবেশ রক্ষায় অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের দাবি, শুধু অভিযান পরিচালনা করেই দায়িত্ব শেষ নয়, বরং অবৈধ বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

 

এখন দেখার বিষয়, স্থানীয়দের এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয় এবং কবে নাগাদ বাঁকখালী নদীকে অবৈধ বালু উত্তোলনের কবল থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

বলীর মাঠে সুনাম, নদীতে ড্রেজার! ইজারাহীন বালু উত্তোলন দিদার বলির

আপডেট সময় ০২:৪৩:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ নভেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলা ও কক্সবাজারের ডিসি সাহেবের বলীখেলায় একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে সুনাম অর্জন করেছেন কুস্তিগীর দিদার বলি। তবে এবার বলীখেলার মাঠের সাফল্যের বাইরে এসে নানা অভিযোগে স্থানীয়দের সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের উমখালী এলাকায় বাঁকখালী নদীতে ড্রেজার বসিয়ে ইজারা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

 

দিদারুল আলম, যিনি স্থানীয়ভাবে দিদার বলি নামে পরিচিত। বলীখেলার মাঠে একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরিচিতি পাওয়া এই কুস্তিগীরের বিরুদ্ধে এখন নদীর বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।

 

এর আগেও মাদকসংক্রান্ত ঘটনায় আলোচনায় এসেছিলেন দিদার বলি। ২০১৮ সালের ২৮ জুন ময়মনসিংহে দুই বন্ধুসহ ২০০ পিস ইয়াবাসহ আটক হন তিনি। এ ঘটনায় ১১ দিন কারাভোগ করেন বলে জানা গেছে। প্রথম আলোর প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা যায়, মাদকসংক্রান্ত অভিযোগের কারণে ২০১৫ সালের ৩ ও ৪ মে কক্সবাজার শহরের বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী ডিসি সাহেবের বলীখেলায় দিদার বলিকে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

 

বর্তমানে তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ, ইজারা ছাড়াই বাঁকখালী নদী থেকে বাণিজ্যিকভাবে বালু উত্তোলন।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, দক্ষিণ মিঠাছড়ির উমখালী পয়েন্টে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দিন-রাত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব বালু ট্রাক ও ডাম্পারযোগে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য করা হচ্ছে। অথচ এ বালু উত্তোলনের জন্য বৈধ ইজারা বা অনুমোদন রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

 

অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযানও হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৪ জুন তৎকালীন রামুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাজ্জাদ জাহিদ রাতুলের নেতৃত্বে ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় ঘটনাস্থল থেকে দিদার বলির দুই সহযোগীকে আটক করা হয়। পরে তাদের মধ্যে একজনকে ৭ দিন এবং অপরজনকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

 

এ সময় জব্দ করা স্ক্যাভেটরটি স্পট নিলামের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫২ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। ভ্যাট ও আয়করসহ এর মোট মূল্য দাঁড়ায় ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। জব্দ করা বালুও স্পট নিলামে বিক্রি করা হয়।

 

তবে প্রশাসনের এমন অভিযানের পরও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, প্রশাসনের অভিযান ও জরিমানার পরও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় নদী থেকে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে।

 

স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, দিদার বলি এলাকার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয় বলে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। এ কারণে অনেকেই তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে রাজি হন না। আমরা চাই, প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করুক এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক।

 

স্থানীয়দের আশঙ্কা, অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে আশপাশের ফসলি জমি, বসতভিটা ও নদীর তীরবর্তী বাঁধ মারাত্মক ভাঙনঝুঁকিতে পড়ছে। পাশাপাশি ভারী যানবাহনে বালু পরিবহনের কারণে গ্রামের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

 

পরিবেশসংশ্লিষ্টদের মতে, নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ ও স্বাভাবিক প্রবাহের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এর প্রভাবে নদীভাঙন, কৃষিজমি ও বসতভিটার ক্ষতিসহ দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকে।

 

এ বিষয়ে অভিযুক্ত দিদার বলির বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে খুদে বার্তা পাঠিয়ে তার বক্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

 

অন্যদিকে, এ বিষয়ে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

 

নদী ও পরিবেশ রক্ষায় অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের দাবি, শুধু অভিযান পরিচালনা করেই দায়িত্ব শেষ নয়, বরং অবৈধ বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

 

এখন দেখার বিষয়, স্থানীয়দের এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয় এবং কবে নাগাদ বাঁকখালী নদীকে অবৈধ বালু উত্তোলনের কবল থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।