ছাত্র সংসদ থেকে জাতীয় সংসদ: তরুণ মনোজগতের পরিবর্তন ও রাজনীতির নতুন দিগন্তের উন্মোচন

- আপডেট সময় ০৯:৪০:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৩৮২ বার পড়া হয়েছে
।। আলী ওসমান শেফায়েত ।।
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক অভাবনীয় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের লালিত রাজনৈতিক বয়ান, একপেশে বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ এবং পেশিশক্তি নির্ভর জনতুষ্টির সস্তা তত্ত্বগুলো আজ নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক সচেতনতার সামনে ম্লান হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের অভাবনীয় সাফল্য কেবল একটি ছাত্র সংগঠনের জয় নয়, বরং এটি দশকের পর দশক ধরে চলে আসা একপেশে বয়ানের সলিল সমাধি। এই বিজয় প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক প্রলয়ংকরী পরিবর্তন ঘটে গেছে। মধুর ক্যান্টিন থেকে গ্রামের চায়ের দোকান—আজ সর্বত্র একই প্রশ্ন: এই পরিবর্তনের গতিপথ জাতীয় রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে?
জকসু নির্বাচন কি ১২ ফেব্রুয়ারির চূড়ান্ত মহড়া?
ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের ঠিক আগে অনুষ্ঠিত হওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জকসু) নির্বাচনের ফলাফলকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেখছেন জাতীয় নির্বাচনের ‘প্রাথমিক জরিপ’ বা ‘এসিড টেস্ট’ হিসেবে। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর পর রাজধানীর অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রশিবিরের এই বিজয় স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে—তরুণ ভোটারদের চিন্তাভাবনা এখন কোন দিকে বইছে। দেশের শিক্ষিত ও সচেতন তরুণ সমাজ যখন ব্যালটের মাধ্যমে তাদের রায় জানিয়ে দিয়েছে, তখন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে এর প্রতিফলন ঘটা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোর এই ফলাফল প্রমাণ করে যে, রাজধানীর মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মধ্যেও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তীব্র।
বয়ান পরিবর্তনের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বিচারিতা:
দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক বলয় থেকে এই বয়ান প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল যে—ইসলামী ধারার রাজনীতি কেবল অশিক্ষিত বা রক্ষণশীল গ্রামীণ জনপদে সীমাবদ্ধ। প্রচার করা হতো, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রগতিশীল’ আঙিনায় বা আধুনিক প্রজন্মের কাছে এদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। কিন্তু যখন দেখা গেল, দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলোতে শিক্ষার্থীরা প্যানেল ধরে ছাত্রশিবিরকে বিজয়ী করছে, তখন তথাকথিত বিশ্লেষকদের সুর রাতারাতি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল।
এখন নতুন বয়ান দেওয়া হচ্ছে—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘অধিক সচেতন’ বলেই তারা বুঝে-শুনে ভোট দিয়েছে। এটি মূলত এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব। যারা আগে এই ধারাকে ‘প্রগতিবিরোধী’ বলে প্রত্যাখ্যান করত, তারা এখন তাদের বিজয়কে ‘সচেতন শিক্ষার্থীদের পছন্দ’ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির তাদের মেধা, যোগ্যতা এবং সুশৃঙ্খল আচরণের মাধ্যমে আধুনিক প্রজন্মের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে। এই বয়ান পরিবর্তন আসলে তথাকথিত প্রগতিশীলদের পরাজয়ের গ্লানি ঢাকার এক ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।
ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও বর্তমান সংকট:
বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি ১৯৫২, ১৯৬৯ এবং ১৯৭১-এর ঐতিহ্যের ধারক। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তির কারণে এটি কলুষিত হয়। গত দেড় দশকে হল দখল, সিট বাণিজ্য এবং ‘গেস্টরুম কালচার’-এর মতো বীভৎস প্রথা ছাত্র রাজনীতিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে আতঙ্কের বিষয়ে পরিণত করেছিল। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এই অচলায়তন ভেঙে দিয়েছে। তরুণ প্রজন্ম এখন আর গতানুগতিক, সহিংস ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিতে বিশ্বাস রাখতে রাজি নয়। তারা চাইছে এমন নেতৃত্ব, যারা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে এবং ক্যাম্পাসের পরিবেশকে করবে নিরাপদ। এই চাওয়া পূরণে ছাত্রশিবিরকে তারা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে করেছে কারণ শিবিরের কর্মীরা একাডেমিক ও নৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে।
মিশ্র নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য ও আগামীর চ্যালেঞ্জ:
প্রতিটি ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ফলাফল একটি ‘মিশ্র নেতৃত্ব’ বা ‘কম্পোজিট লিডারশিপ’-এর ইঙ্গিত দেয়। যেখানে শীর্ষ পদগুলোর মধ্যে কোনো না কোনোটি স্বতন্ত্র বা ভিন্ন মতাবলম্বীরা পেয়েছেন। এই মিশ্র ফলাফল মূলত গণতন্ত্রের এক অনন্য সৌন্দর্য। এটি প্রমাণ করে যে, শিক্ষার্থীরা কোনো একক গোষ্ঠীর হাতে সম্পূর্ণ ক্ষমতা তুলে না দিয়ে একটি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্ব দেখতে চেয়েছে।
এই মিশ্র নেতৃত্ব বিজয়ীদের জন্য এক দুর্লভ সুযোগ। ভিন্নমতের সাথে সহাবস্থান ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ক্যাম্পাস পরিচালনার মাধ্যমেই তারা প্রমাণ করতে পারবে যে তারা কতটা গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। এটি তাদের ‘সিস্টেম ইমপ্রুভমেন্ট’-এর একটি বড় পরীক্ষা। যদি তারা বিরোধী মতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কাজ করতে পারে, তবে তা জাতীয় রাজনীতির জন্য একটি অনুকরণীয় ইনসাফভিত্তিক মডেল হবে। এটি প্রমাণ করবে যে, ইসলামী ধারার রাজনীতি কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং এটি প্রয়োগিক ক্ষেত্রেও অত্যন্ত আধুনিক ও উদার।
রাজনৈতিক মেরুকরণ:
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই ব্যালট বিপ্লব জাতীয় রাজনীতিতে এক বিশাল ঢেউ তুলেছে। দীর্ঘদিনের জুলুম-নির্যাতন, গুম ও হত্যার শিকার হওয়া জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির এখন জনগণের সহানুভূতি ও আস্থা—উভয়ই অর্জন করেছে। চব্বিশের বিপ্লবের পর থেকে তাদের সুশৃঙ্খল কর্মকাণ্ড, জনসেবা এবং প্রতিশোধহীন রাজনীতির চর্চা সাধারণ মানুষের মনে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করেছে। শিক্ষিত যুবসমাজ যখন ধীরে ধীরে এই পতাকাতলে ভিড়ছে, তখন এটি স্পষ্ট যে জামায়াত এখন আর কেবল ‘ক্যাডার ভিত্তিক’ দল নয়, বরং এটি একটি ‘গণমানুষের দল’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত যদি এই তারুণ্যের সমর্থনকে ভোটে রূপান্তর করতে পারে, তবে তারাই হবে আগামীর ক্ষমতার প্রধান অংশীদার।
বিএনপির উদ্বেগ:
ছাত্র সংসদ নির্বাচনের এই ফলাফল প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একসময় ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রদলের যে নিরঙ্কুশ আধিপত্য ছিল, তা আজ মেধা ও শৃঙ্খলার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে, ২০২৪ এর বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে কেবল ‘পুরনো জনপ্রিয়তার’ ওপর ভর করে বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব নয়। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের পরাজয় আসলে বিএনপির জন্য একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা বা ‘ওয়েক-আপ কল’।
তরুণ প্রজন্ম আজ কেবল শ্লোগান নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কার ও নৈতিক রাজনীতির নিশ্চয়তা চায়। বিএনপি যদি এখনো তাদের দলের অভ্যন্তরে শুদ্ধি অভিযান না চালায় এবং চাঁদাবাজি বা দখলদারিত্বের অভিযোগ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে না পারে, তবে পরিবর্তনের এই বিশাল সুযোগ তাদের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপিকে টিকে থাকতে হলে তাদের জামায়াতের মতো সুশৃঙ্খল ও আদর্শিক কাঠামোর সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে। তা না হলে, ইতিহাসের পাতায় তারা কেবল এক সময়ের বড় দল হিসেবেই রয়ে যাবে, নেতৃত্বের হাল চলে যাবে নতুন প্রজন্মের পছন্দের শক্তির হাতে।
শহর থেকে গ্রাম—এক অবিভাজ্য মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব:
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমাজের ‘নার্ভ সেন্টার’। এখান থেকে যে ঢেউ উঠেছে, তা আজ প্রান্তিক জনপদে পৌঁছে গেছে। সাধারণ মানুষ যখন দেখছে দেশের সবচেয়ে মেধাবী সন্তানরা একটি নির্দিষ্ট ধারাকে গ্রহণ করছে, তখন গ্রামীণ জনপদেও সেই আস্থার প্রতিফলন ঘটা স্বাভাবিক। মানুষ আজ ক্লান্ত: তারা পেশিশক্তির আস্ফালন, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতির অবসান চায়। তারা কেবল ক্ষমতার হাতবদল নয়, বরং রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার চায়। মধুর ক্যান্টিন থেকে গ্রামের চায়ের দোকান—আজ সবার কণ্ঠে একই সুর। এই সুরই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ব্যালট পেপারে প্রতিধ্বনিত হবে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটার ফ্যাক্টর:
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা হবে নির্ণায়ক শক্তি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। এই বিশাল গোষ্ঠীটি আজ আধুনিক, দুর্নীতিমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তারা যে রায় দিয়েছে, তা আসলে জাতীয় নির্বাচনেরই মহড়া। জামায়াতে ইসলামী যদি তাদের এই আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি সাধারণ ভোটারদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে পারে, তবে ১২ ফেব্রুয়ারি এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হবে বাংলাদেশ।
উপসংহার:
বাংলাদেশ আজ এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে। পুরনো দিনের সেই ক্ষয়ে যাওয়া ব্যবস্থা, দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো আর টিকতে পারবে না। শীর্ষ পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়ধ্বনি প্রমাণ করে যে, ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন কিছু গড়ার আহ্বান ধ্বনিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের কারিগর আমাদের তরুণ সমাজ এবং সচেতন আপামর জনতা।
“চাই সংস্কার: ভাঙা সিস্টেম, পঁচাগলা পুরনো দিন হবে শেষ,
নতুন দিনের নির্মাতা, চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ।”
এই স্লোগান এখন ১৬ কোটি মানুষের প্রাণের দাবি। আশা করছি, ছাত্রসংসদ নির্বাচনে মেধার যে জয় হয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তা গণমানুষের আস্থার জয়ে রূপান্তরিত হবে। সময় এসেছে পুরনোকে বিদায় জানিয়ে নতুন ভোরে পা রাখার। তরুণ প্রজন্মের এই জাগরণ বাংলাদেশের রাজনীতিকে পরিচ্ছন্ন করবে, উন্নত করবে এবং এক নতুন, আলোকিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করবে—এটাই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
লেখক ও কলামিস্ট
কুতুবদিয়া, কক্সবাজার।




















