কক্সবাজার ০৫:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফিরে দেখা পলাশীর ট্র্যাজেডি

আলী ওসমান শেফায়েত
  • আপডেট সময় ০২:৩৯:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
  • / ৩২৭ বার পড়া হয়েছে

আজ ২৩ জুন। উপমহাদেশের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর দিন। ১৭৫৭ সালের এই দিনে পলাশীর আম্রকাননে সংঘটিত হয়েছিল এমন এক ঘটনা, যার অভিঘাত শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা নির্ধারণ করে দিয়েছিল বাংলার ভবিষ্যৎ এবং বদলে দিয়েছিল একটি জাতির রাজনৈতিক ভাগ্য। রবার্ট ক্লাইভের সুপরিকল্পিত চক্রান্ত এবং মীর জাফর আলী খানের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে পতন ঘটে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার। পলাশীর পরাজয় ছিল না কেবল একজন শাসকের পতন; এটি ছিল একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের দীর্ঘ পরাধীনতার সূচনা, যার স্থায়িত্ব ছিল প্রায় ১৯০ বছর (১৭৫৭ – ১৯৪৭)।

 

দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ পলাশী দিবস শুধু অতীতের শোক স্মরণ করায় না, আমাদের বর্তমান বাস্তবতার সামনেও দাঁড় করায়। ইতিহাসের আয়নায় নিজেদের দেখার এ এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

 

ষড়যন্ত্রের জালে নবাবের পতন:

১৭৫৬ সালের এপ্রিলে আলিবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর মাত্র ২৩ বছর বয়সে বাংলার মসনদে বসেন সিরাজউদ্দৌলা। কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই তিনি বহুমুখী ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হন। রাজপরিবারের অভ্যন্তর, প্রশাসনের প্রভাবশালী অংশ, সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এবং বিদেশি বণিকস্বার্থ—সব মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে এক অশুভ জোট।

 

এই চক্রান্তে জড়িয়ে পড়েন ঘষেটি বেগম, রাজা রাজবল্লভ, কৃষ্ণদাস, প্রধান সেনাপতি মীর জাফর, রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফ খান, মীর কাজিমসহ তৎকালীন ক্ষমতাকেন্দ্রের একাধিক ব্যক্তি। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন জুগিয়েছিলেন জগৎ শেঠ, স্বরূপ চাঁদ, উমিচাঁদ এবং নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। অন্যদিকে পুরো পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, যার নেতৃত্বে ছিলেন রবার্ট ক্লাইভ, উইলিয়াম ওয়াটস, লুক স্ক্রাফটন ও অ্যাডমিরাল চার্লস ওয়াটসন।

 

ঐতিহাসিকদের মতে, সংখ্যার বিচারে নবাবের বাহিনী ইংরেজদের তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী ছিল। কিন্তু যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করেছিল অস্ত্রের শক্তি নয়, বিশ্বাসঘাতকতার গভীরতা। নিখিল নাথ রায়ের মুর্শিদাবাদ কাহিনী এবং মোবাশ্বের আলীর বাংলাদেশের সন্ধানে গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, বিশাল বাহিনী থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ও নেতৃত্বের বিভক্তির কারণে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন। প্রকৃত অর্থে পলাশীতে বিজয়ী হয়েছিল ইংরেজ বাহিনীর চেয়ে বেশি একটি ষড়যন্ত্রের জোট।

 

ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে যদি সিরাজউদ্দৌলা সময়মতো মীর জাফরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতেন, তাহলে ইতিহাসের গতিপথ ভিন্নও হতে পারত। কিন্তু ২৩ জুনের সেই সকাল বাংলার জন্য নিয়ে আসে এক অনিবার্য বিপর্যয়। মীর মদন ও মোহন লালের মতো বীর যোদ্ধাদের আত্মত্যাগও শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসঘাতকতার দেয়াল ভেদ করতে পারেনি।

 

শোষণের দীর্ঘ অধ্যায়:

পলাশীর পরাজয়ের পর শুধু একজন নবাবের পতন ঘটেনি; পতন ঘটেছিল বাংলার অর্থনৈতিক স্বাধীনতারও। একসময় বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বাংলা ধীরে ধীরে পরিণত হয় উপনিবেশিক শোষণের ক্ষেত্রভূমিতে। বাংলার সম্পদ, কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যকে ব্যবহার করা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থে, আর এর মূল্য দিতে হয়েছে এদেশের সাধারণ মানুষকে।

 

দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের যে দীর্ঘ ইতিহাস পরবর্তীকালে রচিত হয়েছে, তার সূচনাবিন্দু খুঁজে পাওয়া যায় পলাশীর সেই প্রান্তরেই।

 

পলাশীর পর শহীদ তিতুমীর, হাজী শরিয়তুল্লাহ, দুদু মিয়া, শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিস দেহলভী, বালাকোটের শহীদ সাইয়েদ আহমদ ও শাহ ইসমাঈলসহ অসংখ্য আলেম, মুজাহিদ ও দেশপ্রেমিক মানুষের আত্মত্যাগ, আন্দোলন এবং দীর্ঘ প্রতিরোধ সংগ্রামের পথ ধরেই আমরা পরবর্তীকালে দুই দফা স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছি। পেয়েছি স্বাধীন ভূখণ্ড ও লাল-সবুজের পতাকা। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর আজও প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি প্রকৃত অর্থে সেই পরাধীনতার সব উত্তরাধিকার থেকে মুক্ত হতে পেরেছি?

 

বাস্তবতা হলো, ঔপনিবেশিক শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটলেও তার মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি। শিক্ষা, প্রশাসন, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির নানা স্তরে এখনও সেই উত্তরাধিকার দৃশ্যমান। ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক নির্ভরতা এবং সাংস্কৃতিক আত্মবিস্মৃতির বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম আজও শেষ হয়নি।

 

বর্তমানের আয়নায় পলাশী:

পলাশীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কোনো জাতির জন্য বাহ্যিক শত্রুর চেয়ে অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা অনেক সময় বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ইতিহাসে মীর জাফরের নাম ঘৃণার প্রতীক হয়ে থাকলেও, বিশ্বাসঘাতকতার মানসিকতা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা যুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

 

আজও নানা ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতালিপ্সা ও গোষ্ঠীগত সুবিধার জন্য জাতীয় স্বার্থ বিসর্জনের ঘটনা দেখা যায়। এ কারণেই পলাশী কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়; এটি আমাদের জন্য এক চলমান সতর্কবার্তা।

 

প্রশ্ন জাগে, কেন এখনো আমাদের নীতিনির্ধারণী চিন্তায় বিদেশি শক্তির প্রভাব নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়? কেন রাজনৈতিক বৈধতা বা কূটনৈতিক সমর্থনের প্রশ্নে অনেকেই জনগণের আস্থার চেয়ে বাইরের শক্তির অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেন? কেন জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আমরা বারবার বিভক্ত হয়ে পড়ি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ইতিহাসের কাছেই ফিরে যেতে হবে।

 

পলাশী আমাদের শিখিয়েছে, কোনো বিদেশি শক্তি একা কোনো জাতিকে পরাধীন করতে পারে না; তার জন্য প্রয়োজন ভেতরের সহযোগী। ক্লাইভের বিজয়ের পেছনে যেমন ছিল মীর জাফর ও তার সহযোগীরা, তেমনি ইতিহাসের প্রতিটি জাতীয় বিপর্যয়ের পেছনেও থাকে কিছু স্বার্থান্বেষী শক্তি, যারা ব্যক্তিগত লাভের জন্য বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করতে দ্বিধা করে না।

 

ইতিহাসের শিক্ষা:

ইতিহাস কখনো নিছক অতীত নয়; এটি ভবিষ্যতের পথনির্দেশকও বটে। পলাশী আমাদের শিখিয়েছে, জাতীয় ঐক্যের অভাব, দূরদর্শিতার সংকট এবং অভ্যন্তরীণ বিভক্তি একটি জাতিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।

 

তাই আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং জাতীয় সংহতির। নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তিতে একটি আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের অঙ্গীকার।

 

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় পলাশীর স্মৃতি উচ্চারণ করেছিলেন সতর্কবার্তা হিসেবে। কারণ পলাশী শুধু শোকের ইতিহাস নয়; এটি সতর্কতার ইতিহাসও। তিনি লিখেছিলেন—

 

“কাণ্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,

বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!”

 

নজরুলের এই আহ্বান আজও সমান প্রাসঙ্গিক। কারণ ইতিহাসের নদীতে দুলতে থাকা জাতির তরীকে নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিকল্প নেই।

 

পলাশীর ২৬৯ বছর পরও ইতিহাসের সেই সতর্কবার্তা অম্লান। জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি তার ঐক্য, আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার বিভক্তি। পলাশীর প্রান্তর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—যে জাতি নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করা শক্তিকে সময়মতো চিনতে ব্যর্থ হয়, ইতিহাস তাকে বারবার একই মূল্য চুকাতে বাধ্য করে।

 

পলাশী দিবসের চেতনা তাই শুধুমাত্র অতীতের শোক স্মরণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণে, জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার অঙ্গীকারে এবং ভবিষ্যতের যেকোনো ষড়যন্ত্র ও বিভক্তির বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার প্রত্যয়ে। তবেই পূর্বসূরিদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা পাবে, অর্থবহ হবে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্জন।

 

—আলী ওসমান শেফায়েত

লেখক ও কলামিস্ট

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

ফিরে দেখা পলাশীর ট্র্যাজেডি

আপডেট সময় ০২:৩৯:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

আজ ২৩ জুন। উপমহাদেশের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর দিন। ১৭৫৭ সালের এই দিনে পলাশীর আম্রকাননে সংঘটিত হয়েছিল এমন এক ঘটনা, যার অভিঘাত শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা নির্ধারণ করে দিয়েছিল বাংলার ভবিষ্যৎ এবং বদলে দিয়েছিল একটি জাতির রাজনৈতিক ভাগ্য। রবার্ট ক্লাইভের সুপরিকল্পিত চক্রান্ত এবং মীর জাফর আলী খানের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে পতন ঘটে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার। পলাশীর পরাজয় ছিল না কেবল একজন শাসকের পতন; এটি ছিল একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের দীর্ঘ পরাধীনতার সূচনা, যার স্থায়িত্ব ছিল প্রায় ১৯০ বছর (১৭৫৭ – ১৯৪৭)।

 

দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ পলাশী দিবস শুধু অতীতের শোক স্মরণ করায় না, আমাদের বর্তমান বাস্তবতার সামনেও দাঁড় করায়। ইতিহাসের আয়নায় নিজেদের দেখার এ এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

 

ষড়যন্ত্রের জালে নবাবের পতন:

১৭৫৬ সালের এপ্রিলে আলিবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর মাত্র ২৩ বছর বয়সে বাংলার মসনদে বসেন সিরাজউদ্দৌলা। কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই তিনি বহুমুখী ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হন। রাজপরিবারের অভ্যন্তর, প্রশাসনের প্রভাবশালী অংশ, সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এবং বিদেশি বণিকস্বার্থ—সব মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে এক অশুভ জোট।

 

এই চক্রান্তে জড়িয়ে পড়েন ঘষেটি বেগম, রাজা রাজবল্লভ, কৃষ্ণদাস, প্রধান সেনাপতি মীর জাফর, রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফ খান, মীর কাজিমসহ তৎকালীন ক্ষমতাকেন্দ্রের একাধিক ব্যক্তি। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন জুগিয়েছিলেন জগৎ শেঠ, স্বরূপ চাঁদ, উমিচাঁদ এবং নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। অন্যদিকে পুরো পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, যার নেতৃত্বে ছিলেন রবার্ট ক্লাইভ, উইলিয়াম ওয়াটস, লুক স্ক্রাফটন ও অ্যাডমিরাল চার্লস ওয়াটসন।

 

ঐতিহাসিকদের মতে, সংখ্যার বিচারে নবাবের বাহিনী ইংরেজদের তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী ছিল। কিন্তু যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করেছিল অস্ত্রের শক্তি নয়, বিশ্বাসঘাতকতার গভীরতা। নিখিল নাথ রায়ের মুর্শিদাবাদ কাহিনী এবং মোবাশ্বের আলীর বাংলাদেশের সন্ধানে গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, বিশাল বাহিনী থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ও নেতৃত্বের বিভক্তির কারণে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন। প্রকৃত অর্থে পলাশীতে বিজয়ী হয়েছিল ইংরেজ বাহিনীর চেয়ে বেশি একটি ষড়যন্ত্রের জোট।

 

ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে যদি সিরাজউদ্দৌলা সময়মতো মীর জাফরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতেন, তাহলে ইতিহাসের গতিপথ ভিন্নও হতে পারত। কিন্তু ২৩ জুনের সেই সকাল বাংলার জন্য নিয়ে আসে এক অনিবার্য বিপর্যয়। মীর মদন ও মোহন লালের মতো বীর যোদ্ধাদের আত্মত্যাগও শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসঘাতকতার দেয়াল ভেদ করতে পারেনি।

 

শোষণের দীর্ঘ অধ্যায়:

পলাশীর পরাজয়ের পর শুধু একজন নবাবের পতন ঘটেনি; পতন ঘটেছিল বাংলার অর্থনৈতিক স্বাধীনতারও। একসময় বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বাংলা ধীরে ধীরে পরিণত হয় উপনিবেশিক শোষণের ক্ষেত্রভূমিতে। বাংলার সম্পদ, কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যকে ব্যবহার করা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থে, আর এর মূল্য দিতে হয়েছে এদেশের সাধারণ মানুষকে।

 

দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের যে দীর্ঘ ইতিহাস পরবর্তীকালে রচিত হয়েছে, তার সূচনাবিন্দু খুঁজে পাওয়া যায় পলাশীর সেই প্রান্তরেই।

 

পলাশীর পর শহীদ তিতুমীর, হাজী শরিয়তুল্লাহ, দুদু মিয়া, শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিস দেহলভী, বালাকোটের শহীদ সাইয়েদ আহমদ ও শাহ ইসমাঈলসহ অসংখ্য আলেম, মুজাহিদ ও দেশপ্রেমিক মানুষের আত্মত্যাগ, আন্দোলন এবং দীর্ঘ প্রতিরোধ সংগ্রামের পথ ধরেই আমরা পরবর্তীকালে দুই দফা স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছি। পেয়েছি স্বাধীন ভূখণ্ড ও লাল-সবুজের পতাকা। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর আজও প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি প্রকৃত অর্থে সেই পরাধীনতার সব উত্তরাধিকার থেকে মুক্ত হতে পেরেছি?

 

বাস্তবতা হলো, ঔপনিবেশিক শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটলেও তার মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি। শিক্ষা, প্রশাসন, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির নানা স্তরে এখনও সেই উত্তরাধিকার দৃশ্যমান। ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক নির্ভরতা এবং সাংস্কৃতিক আত্মবিস্মৃতির বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম আজও শেষ হয়নি।

 

বর্তমানের আয়নায় পলাশী:

পলাশীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কোনো জাতির জন্য বাহ্যিক শত্রুর চেয়ে অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা অনেক সময় বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ইতিহাসে মীর জাফরের নাম ঘৃণার প্রতীক হয়ে থাকলেও, বিশ্বাসঘাতকতার মানসিকতা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা যুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

 

আজও নানা ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতালিপ্সা ও গোষ্ঠীগত সুবিধার জন্য জাতীয় স্বার্থ বিসর্জনের ঘটনা দেখা যায়। এ কারণেই পলাশী কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়; এটি আমাদের জন্য এক চলমান সতর্কবার্তা।

 

প্রশ্ন জাগে, কেন এখনো আমাদের নীতিনির্ধারণী চিন্তায় বিদেশি শক্তির প্রভাব নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়? কেন রাজনৈতিক বৈধতা বা কূটনৈতিক সমর্থনের প্রশ্নে অনেকেই জনগণের আস্থার চেয়ে বাইরের শক্তির অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেন? কেন জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আমরা বারবার বিভক্ত হয়ে পড়ি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ইতিহাসের কাছেই ফিরে যেতে হবে।

 

পলাশী আমাদের শিখিয়েছে, কোনো বিদেশি শক্তি একা কোনো জাতিকে পরাধীন করতে পারে না; তার জন্য প্রয়োজন ভেতরের সহযোগী। ক্লাইভের বিজয়ের পেছনে যেমন ছিল মীর জাফর ও তার সহযোগীরা, তেমনি ইতিহাসের প্রতিটি জাতীয় বিপর্যয়ের পেছনেও থাকে কিছু স্বার্থান্বেষী শক্তি, যারা ব্যক্তিগত লাভের জন্য বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করতে দ্বিধা করে না।

 

ইতিহাসের শিক্ষা:

ইতিহাস কখনো নিছক অতীত নয়; এটি ভবিষ্যতের পথনির্দেশকও বটে। পলাশী আমাদের শিখিয়েছে, জাতীয় ঐক্যের অভাব, দূরদর্শিতার সংকট এবং অভ্যন্তরীণ বিভক্তি একটি জাতিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।

 

তাই আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং জাতীয় সংহতির। নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তিতে একটি আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের অঙ্গীকার।

 

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় পলাশীর স্মৃতি উচ্চারণ করেছিলেন সতর্কবার্তা হিসেবে। কারণ পলাশী শুধু শোকের ইতিহাস নয়; এটি সতর্কতার ইতিহাসও। তিনি লিখেছিলেন—

 

“কাণ্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,

বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!”

 

নজরুলের এই আহ্বান আজও সমান প্রাসঙ্গিক। কারণ ইতিহাসের নদীতে দুলতে থাকা জাতির তরীকে নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিকল্প নেই।

 

পলাশীর ২৬৯ বছর পরও ইতিহাসের সেই সতর্কবার্তা অম্লান। জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি তার ঐক্য, আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার বিভক্তি। পলাশীর প্রান্তর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—যে জাতি নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করা শক্তিকে সময়মতো চিনতে ব্যর্থ হয়, ইতিহাস তাকে বারবার একই মূল্য চুকাতে বাধ্য করে।

 

পলাশী দিবসের চেতনা তাই শুধুমাত্র অতীতের শোক স্মরণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণে, জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার অঙ্গীকারে এবং ভবিষ্যতের যেকোনো ষড়যন্ত্র ও বিভক্তির বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার প্রত্যয়ে। তবেই পূর্বসূরিদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা পাবে, অর্থবহ হবে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্জন।

 

—আলী ওসমান শেফায়েত

লেখক ও কলামিস্ট