কক্সবাজার ০৩:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্মরণ করছি ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের আজকের এই দিন

আলী ওসমান শেফায়েত
  • আপডেট সময় ০৯:২০:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৪৫ বার পড়া হয়েছে

আজ, ১৫ আগস্ট, ২০২৬। আমরা স্মরণ করছি ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রসেনানী শহীদ আব্দুল মালেক-কে। আজ তাঁর শাহাদাতের ৫৬তম বার্ষিকী পূর্ণ হলো। ১৯৬৯ সালের এই দিনে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর জীবন ও শাহাদাত বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

 

শাহাদাতের প্রেক্ষাপট:

১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার আদর্শিক ভিত্তি কী হবে, তা নিয়ে জনমত জরিপ করা। এই জরিপের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি.এস.সি-তে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সেই সময়ে বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা শিক্ষাকে ধর্মমুক্ত করার পক্ষে তীব্র প্রচারণা চালাচ্ছিল। সেই আলোচনা সভায় তারা তাদের বক্তব্য তুলে ধরে।

 

এই প্রেক্ষাপটে, ইসলামী আদর্শের পক্ষে কথা বলতে এগিয়ে আসেন তরুণ, মেধাবী ছাত্রনেতা আব্দুল মালেক। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন বিভাগের সেরা ছাত্র এবং একজন অসাধারণ বাগ্মী। আলোচনা সভায় তাঁকে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। সেই পাঁচ মিনিটেই তিনি ইসলামের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থার যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা এমনভাবে তুলে ধরেন যে, উপস্থিত শ্রোতারা তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

 

তাঁর যুক্তিপূর্ণ ও তথ্যভিত্তিক বক্তব্য বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ বক্তাদের সকল যুক্তিকে খণ্ডন করে দেয়। তাদের তাত্ত্বিক ও বাস্তবতার লড়াইয়ে পরাজিত হয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এই পরাজয়ের পর বাম ও ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী তাদের নেতৃত্বে ছাত্রদের ওপর হামলা চালায়। আব্দুল মালেক তার সঙ্গীদের নিরাপদে বিদায় দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় লোহার রড ও হকি স্টিক দিয়ে সজ্জিত পিশাচ বাহিনীর আক্রমণের শিকার হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিন দিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ১৫ আগস্ট তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

 

শাহাদাতের তাৎপর্য ও আজকের প্রেক্ষাপট:

শহীদ আব্দুল মালেকের শাহাদাত ছিল আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা কেবল চাকরির জন্য নয়, বরং একটি জাতির নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তি গড়ে তোলার প্রধান স্তম্ভ। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা যখন শিক্ষাকে ধর্মমুক্ত করার কথা বলছিল, তখন তিনি ইসলামের শাশ্বত মূল্যবোধ ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ে একটি আদর্শিক শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। তাঁর সেই সংগ্রাম আজও আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।

 

আজকের দিনে, যখন শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় মূল্যবোধের গুরুত্ব নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে, তখন শহীদ আব্দুল মালেকের আদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আমরা প্রায়শই দেখি, একদল মানুষ ধর্মকে জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে আলাদা করার চেষ্টা করে। আব্দুল মালেকের জীবন আমাদের শেখায়, ইসলাম শুধুমাত্র একটি ধর্ম নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।

 

তাঁর শাহাদাতের ফলে তৎকালীন ছাত্রসমাজ আরও সচেতন হয় এবং ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন নতুন গতি পায়। ১৫ আগস্ট তাঁর শাহাদাতকে স্মরণ করে “ইসলামী শিক্ষা দিবস” পালন করা হয়, যা এই আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

 

আমাদের করণীয়:

শহীদ আব্দুল মালেকের শাহাদাত বার্ষিকীতে আমাদের শুধু তাঁকে স্মরণ করলেই হবে না, বরং তাঁর আদর্শকে আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

• জ্ঞান অন্বেষণ: আব্দুল মালেকের মতো জ্ঞান চর্চায় নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে হবে। একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্বের পাশাপাশি আদর্শিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

 

• যুক্তিনির্ভরতা: শুধুমাত্র আবেগের ওপর নির্ভর না করে, তথ্য ও যুক্তি দিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে হবে। তাঁর পাঁচ মিনিটের বক্তব্য আমাদের শেখায়, সঠিক জ্ঞান ও যুক্তি দিয়ে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব।

 

• নৈতিকতা ও আদর্শবাদ: শিক্ষাকে কেবল ক্যারিয়ারের সিঁড়ি হিসেবে না দেখে, নৈতিকতা ও আদর্শের ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

 

শহীদ আব্দুল মালেক আমাদের দেখিয়ে গেছেন, আদর্শের জন্য জীবন উৎসর্গ করাও সম্ভব। তাঁর এই আত্মত্যাগ ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আল্লাহ তাআলা এই মহান শহীদকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন এবং তাঁর আদর্শকে আমাদের জীবনে বাস্তবায়িত করার তৌফিক দিন।

 

—আলী ওসমান শেফায়েত

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

স্মরণ করছি ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের আজকের এই দিন

আপডেট সময় ০৯:২০:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

আজ, ১৫ আগস্ট, ২০২৬। আমরা স্মরণ করছি ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রসেনানী শহীদ আব্দুল মালেক-কে। আজ তাঁর শাহাদাতের ৫৬তম বার্ষিকী পূর্ণ হলো। ১৯৬৯ সালের এই দিনে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর জীবন ও শাহাদাত বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

 

শাহাদাতের প্রেক্ষাপট:

১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার আদর্শিক ভিত্তি কী হবে, তা নিয়ে জনমত জরিপ করা। এই জরিপের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি.এস.সি-তে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সেই সময়ে বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা শিক্ষাকে ধর্মমুক্ত করার পক্ষে তীব্র প্রচারণা চালাচ্ছিল। সেই আলোচনা সভায় তারা তাদের বক্তব্য তুলে ধরে।

 

এই প্রেক্ষাপটে, ইসলামী আদর্শের পক্ষে কথা বলতে এগিয়ে আসেন তরুণ, মেধাবী ছাত্রনেতা আব্দুল মালেক। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন বিভাগের সেরা ছাত্র এবং একজন অসাধারণ বাগ্মী। আলোচনা সভায় তাঁকে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। সেই পাঁচ মিনিটেই তিনি ইসলামের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থার যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা এমনভাবে তুলে ধরেন যে, উপস্থিত শ্রোতারা তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

 

তাঁর যুক্তিপূর্ণ ও তথ্যভিত্তিক বক্তব্য বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ বক্তাদের সকল যুক্তিকে খণ্ডন করে দেয়। তাদের তাত্ত্বিক ও বাস্তবতার লড়াইয়ে পরাজিত হয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এই পরাজয়ের পর বাম ও ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী তাদের নেতৃত্বে ছাত্রদের ওপর হামলা চালায়। আব্দুল মালেক তার সঙ্গীদের নিরাপদে বিদায় দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় লোহার রড ও হকি স্টিক দিয়ে সজ্জিত পিশাচ বাহিনীর আক্রমণের শিকার হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিন দিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ১৫ আগস্ট তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

 

শাহাদাতের তাৎপর্য ও আজকের প্রেক্ষাপট:

শহীদ আব্দুল মালেকের শাহাদাত ছিল আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা কেবল চাকরির জন্য নয়, বরং একটি জাতির নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তি গড়ে তোলার প্রধান স্তম্ভ। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা যখন শিক্ষাকে ধর্মমুক্ত করার কথা বলছিল, তখন তিনি ইসলামের শাশ্বত মূল্যবোধ ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ে একটি আদর্শিক শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। তাঁর সেই সংগ্রাম আজও আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।

 

আজকের দিনে, যখন শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় মূল্যবোধের গুরুত্ব নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে, তখন শহীদ আব্দুল মালেকের আদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আমরা প্রায়শই দেখি, একদল মানুষ ধর্মকে জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে আলাদা করার চেষ্টা করে। আব্দুল মালেকের জীবন আমাদের শেখায়, ইসলাম শুধুমাত্র একটি ধর্ম নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।

 

তাঁর শাহাদাতের ফলে তৎকালীন ছাত্রসমাজ আরও সচেতন হয় এবং ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন নতুন গতি পায়। ১৫ আগস্ট তাঁর শাহাদাতকে স্মরণ করে “ইসলামী শিক্ষা দিবস” পালন করা হয়, যা এই আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

 

আমাদের করণীয়:

শহীদ আব্দুল মালেকের শাহাদাত বার্ষিকীতে আমাদের শুধু তাঁকে স্মরণ করলেই হবে না, বরং তাঁর আদর্শকে আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

• জ্ঞান অন্বেষণ: আব্দুল মালেকের মতো জ্ঞান চর্চায় নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে হবে। একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্বের পাশাপাশি আদর্শিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

 

• যুক্তিনির্ভরতা: শুধুমাত্র আবেগের ওপর নির্ভর না করে, তথ্য ও যুক্তি দিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে হবে। তাঁর পাঁচ মিনিটের বক্তব্য আমাদের শেখায়, সঠিক জ্ঞান ও যুক্তি দিয়ে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব।

 

• নৈতিকতা ও আদর্শবাদ: শিক্ষাকে কেবল ক্যারিয়ারের সিঁড়ি হিসেবে না দেখে, নৈতিকতা ও আদর্শের ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

 

শহীদ আব্দুল মালেক আমাদের দেখিয়ে গেছেন, আদর্শের জন্য জীবন উৎসর্গ করাও সম্ভব। তাঁর এই আত্মত্যাগ ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আল্লাহ তাআলা এই মহান শহীদকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন এবং তাঁর আদর্শকে আমাদের জীবনে বাস্তবায়িত করার তৌফিক দিন।

 

—আলী ওসমান শেফায়েত