নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলে শতভাগ জিপিএ-৫, ২১৯ শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন

- আপডেট সময় ০৮:০৪:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
- / ১২৯ বার পড়া হয়েছে
নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৮২ শিক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পাওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত ৬০১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২১৯ জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ায় তাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না—এ নিয়ে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা খানের ১৬ আগস্ট স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষককে এ নোটিশ দেওয়া হয়। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্রসহ সশরীরে বোর্ডে উপস্থিত হয়ে অভিযোগের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। অফিস আদেশে বিষয়টিকে ‘অত্যন্ত জরুরি’ উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে প্রতিষ্ঠানে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের তথ্য, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের তালিকা, এসএসসির নির্বাচনী (টেস্ট) পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের তথ্য এবং চূড়ান্তভাবে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণকারী শিক্ষার্থীদের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে পাঠদান, বিভাগ ও অতিরিক্ত শ্রেণি শাখার অনুমতি-সংক্রান্ত নথিও উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।
বোর্ড জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শোকজের জবাব না দিলে অথবা দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৩৮২ পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫
চলতি বছর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে এসএসসি পরীক্ষায় মোট ৩৮২ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৩৭৬ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে ছয়জন পরীক্ষার্থী ছিল। তাদের সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে।
গত বছরও প্রতিষ্ঠানটির ৩২০ জন পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছিল। টানা শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়ার সাফল্যে প্রতিষ্ঠানটি প্রশংসিত হলেও এবার নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ও এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যার বড় ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ছিল ৬০১ জন। দুই বছর পর ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩৮২ জন। অর্থাৎ ২১৯ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখিয়ে বাদ দেওয়ার অভিযোগ
অভিভাবক ও কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ, শতভাগ জিপিএ-৫-এর সাফল্য ধরে রাখতে টেস্ট পরীক্ষাকে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া বা দুর্বল শিক্ষার্থীদের টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখিয়ে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
কয়েকজন অভিভাবকের দাবি, টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্ন তুলনামূলক কঠিন করা এবং খাতা কঠোরভাবে মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পরে তাদের কেউ কেউ অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফল করেছে।
নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুল থেকে টিসি নিয়ে চলতি বছর নরসিংদী সানবীন স্কুলে ভর্তি হয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৫০ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ২৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ জানিয়েছেন।
অভিযোগ অস্বীকার প্রধান শিক্ষকের
তবে শিক্ষার্থী বাছাই করে শতভাগ জিপিএ-৫ নিশ্চিত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন।
তিনি জানান, এবারের টেস্ট পরীক্ষায় মোট ৪৮৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে ৩৮২ জন উত্তীর্ণ এবং ১০১ জন অকৃতকার্য হয়। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরই এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয়েছে।
প্রধান শিক্ষক বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় এ প্লাস না পেলে ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয় না—এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ৩৩ শতাংশ নম্বর পেলেই ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রথম দফার টেস্ট পরীক্ষায় ১১৭ জন শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়। অভিভাবকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হয়। এরপরও ১০১ জন নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
আরও প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করছে বোর্ড
শুধু নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস নয়, শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। একইভাবে শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে—এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক ড. মাসুদ রানা খান জানান, টেস্ট পরীক্ষায় পাস করা কোনো শিক্ষার্থীকে শুধু এ প্লাস না পাওয়ার কারণে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ বোর্ডের নজরে এসেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশন, টেস্ট পরীক্ষার ফল ও ফরম পূরণের তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলার পর বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন, টেস্ট পরীক্ষার ফল ও ফরম পূরণের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এদিকে, শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়ার সাফল্যের আড়ালে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের অভিযোগের সত্যতা কতটুকু, তা এখন শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত ও প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ব্যাখ্যার ওপরই নির্ভর করছে।














