মানুষ কেন দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিবে?

- আপডেট সময় ০২:৩২:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫
- / ৭৪১ বার পড়া হয়েছে
আলী ওসমান শেফায়েত
দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের এক জগদ্দল পাথরের মূলোৎপাটনের পরে বাংলাদেশ আবারও এক নির্বাচনমুখী সময়ে প্রবেশ করছে। নানা রাজনৈতিক দল নিজেদেরকে জাতির অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপন করছে, নানা প্রতিশ্রুতি আর স্বপ্ন দেখাচ্ছে জাতিকে। কিন্তু একজন চিন্তাশীল ভোটার হিসেবে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত—আসলে কারা আমাদের নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্ব দিতে পারে? কারা দিতে পারে ন্যায়ভিত্তিক শাসন, শান্তি ও কল্যাণময় সমাজ? কারা পারবে দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে জাতিকে মুক্ত করে সত্যিকার অর্থে জনগণের জন্য কাজ করতে? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই চিরন্তন আদর্শের দিকে, যা আল্লাহর নির্দেশিত পথ, নবীজির (সা.)-এর আদর্শ এবং ইসলামী চিন্তাবিদদের গভীর নির্দেশনার আলোকে সুপ্রতিষ্ঠিত। এই আদর্শই মানবজাতির কল্যাণ ও সফলতার একমাত্র গ্যারান্টি।
ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়ন ও দুর্নীতির মূলোৎপাটন:
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ক্ষমতা কেবল ক্ষমতা দখলের জন্য নয়, বরং তা একটি মহান উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম। সূরা হজ্জের ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আমি যদি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করি, তাহলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে এবং সৎ কাজের আদেশ করবে ও অসৎ কার্য হতে নিষেধ করবে।” (সূরা হজ্জ, আয়াত: ৪১)
এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমতা লাভের মূল উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছেন—ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী সমাজ পরিচালনা। অর্থাৎ, ক্ষমতা শুধুমাত্র রাষ্ট্র পরিচালনার একটি হাতিয়ার নয়, বরং এটি আল্লাহর নির্দেশিত পথে সমাজকে পরিচালিত করার একটি পবিত্র আমানত। আর এই আমানতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুর্নীতিমুক্ত একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কেবল কে এই দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেছে? কে তাদের গঠনতন্ত্র, কর্মসূচি ও নির্বাচনী ইশতেহারে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিকে সর্বাগ্রে রেখেছে, যেখানে দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়?
আমার জানামতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীই একমাত্র দল, যাদের গঠনতন্ত্র, কর্মসূচি ও নির্বাচনী ইশতেহারে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তাদের গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে, “এই জামায়াত একটি দ্বীনী আন্দোলন, যার লক্ষ্য আল্লাহর দীনকে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠা করা।” এই অঙ্গীকার কেবল মুখের কথা বা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাদের সিলেবাস, নেতৃবৃন্দের রচনাসমগ্র এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এই আদর্শিক দৃঢ়তার প্রতিফলন দেখা যায়। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ এবং পরিকল্পনার মূলে রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাত—উভয়ের কল্যাণ সাধন। এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে, দুর্নীতিকে একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করে তার মূলোৎপাটনের অঙ্গীকার জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক অবস্থানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তারা শুধু একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় না, বরং এমন একটি রাষ্ট্র চায় যেখানে প্রতিটি নাগরিকের দুনিয়াবি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি তাদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নতিও নিশ্চিত হবে, এবং যেখানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অপচয় থাকবে না। এই ধরনের একটি ঐশী নির্দেশিত আদর্শিক অবস্থানই জামায়াতকে অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে স্বতন্ত্র করে তোলে।
আদর্শে নেতৃত্ব, আমানতদারি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতা:
ইসলামী নেতৃত্ব মানে কেবল শাসন করা নয়, বরং তা হলো জবাবদিহিমূলক একটি আমানত। রাসূল (সা.) তাঁর অসংখ্য হাদিসে নেতৃত্বের এই মহান দায়িত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের বিষয়ে জবাবদিহি করবে।” (সহিহ বুখারি: ৮৯৩; সহিহ মুসলিম: ১৮২৯) এই হাদিস অনুযায়ী, একজন নেতা তার প্রজাদের কাছে এবং সর্বোপরি আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। এই জবাবদিহিতার অনুভূতিই একজন নেতাকে সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও জনকল্যাণমুখী করে তোলে। দুর্নীতি এই আমানতের চরম খেয়ানত, যা ব্যক্তি ও সমাজের ধ্বংস ডেকে আনে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে চরিত্র, আমানতদারি এবং তাকওয়াকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়। এটি নিছক একটি দলের সদস্য নির্বাচন নয়, বরং ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি সৎ নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া এমন ব্যক্তিদের তৈরি করে যারা দুর্নীতিকে পাপ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদকে জনগণের আমানত মনে করেন। এর ফলস্বরূপ, জামায়াতের সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, মেয়র কিংবা পৌর কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা ভোগবাদিতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বিরল এবং ঈমানদার নেতৃত্বের প্রতিফলন।
যখন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ ওঠে, সরকারি প্রকল্প থেকে শুরু করে সাধারণ প্রশাসনিক কাজেও দুর্নীতির থাবা বিস্তৃত হয়, তখন জামায়াতে ইসলামীর এই স্বচ্ছতা ও সততা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর দুজন সাবেক মন্ত্রী—শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ রাহিমাহুমুল্লাহ, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এই সততা কেবল ব্যক্তিবিশেষের সততা নয়, বরং একটি আদর্শিক আন্দোলনের প্রতিশ্রুতির ফল। এই দল বিশ্বাস করে, নেতৃত্ব জনগণের সেবক এবং আমানত রক্ষক। তাই, তারা এমন ব্যক্তিকে নেতৃত্বে দেখতে চায়, যে আল্লাহর ভয় অন্তরে ধারণ করে এবং নিজের দায়িত্বকে আখিরাতের জবাবদিহিতার অংশ মনে করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থান শুধুমাত্র নির্বাচনী স্লোগান নয়, বরং এটি তাদের আদর্শের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইসলামী চিন্তাবিদদের দৃষ্টিতে ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা:
ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা—যা মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে পরিবেষ্টন করে। ইসলামী রাষ্ট্র, আইন, প্রশাসন, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ন্যায়বিচার—সবকিছুই ইসলামের আওতায় পড়ে। আধুনিক ইসলামী চিন্তাবিদগণ এই বিষয়টিকে বারবার জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন।
বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.), তাঁর ব্যাপক রচনাবলীতে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের ধারণা দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ঈমানদারদের অনুপস্থিতি সমাজে অন্যায় ও অনাচার ডেকে আনে। তাঁর মতে: “আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দীন কায়েম করাই হচ্ছে একজন ঈমানদার ব্যক্তির প্রধান দায়িত্ব। রাজনীতির ময়দান থেকে যদি ইসলামপন্থীরা পিছিয়ে যায়, তাহলে তাগুত শক্তি সে জায়গা পূরণ করবে।” (তাফহীমুল কুরআন)
এই উক্তিটি রাজনৈতিক ময়দানে ইসলামপন্থীদের সক্রিয় থাকার গুরুত্ব বোঝায়। যদি সৎ ও আল্লাহভীরু মানুষ রাজনীতির ময়দান ছেড়ে দেয়, তাহলে অসৎ ও জালেম শক্তি সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে এবং সমাজে অন্যায়, অনাচার ও সর্বোপরি দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়বে।
আরেকজন প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, ইখওয়ানুল মুসলিমীনের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ হাসান আল বান্না (রহ.), তাঁর ‘রিসালাতু তা’আলিম’ (শিক্ষা বার্তা) গ্রন্থে ইসলামের ব্যাপকতাকে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন: “ইসলাম কেবল একটি উপাসনা-পদ্ধতি নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা—রাষ্ট্র, আইন, প্রশাসন, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ন্যায়বিচার সবই ইসলামের আওতায় পড়ে।” (রিসালাতু তা’আলিম)
এই দুটি উক্তিই জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই সব চিন্তাবিদদের মত অনুসরণ করেই কাজ করে যাচ্ছে। তারা মনে করে, রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন কেবল একটি রাজনৈতিক বিজয় নয়, বরং তা আল্লাহর দীনকে পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করার একটি মাধ্যম। তারা চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে আইন প্রণীত হবে, যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, এবং যেখানে অর্থনীতি পরিচালিত হবে হালাল ও হারামের মানদণ্ডে, দুর্নীতিকে যেখানে বিন্দু পরিমাণ প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। ইসলামী আইন ও শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, যা জামায়াত প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে।
জামায়াতের শাসন দুর্নীতিমুক্ত, সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ:
জামায়াত যদি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে, তাহলে তারা কী ধরনের কল্যাণমূলক পরিবর্তন আনবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে? তাদের ইশতেহার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হলো:
১. আল্লাহভীরু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: জামায়াত এমন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে, যারা শুধু পার্থিব ক্ষমতা নয়, বরং আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস ও ভয় অন্তরে ধারণ করে। এই ধরনের নেতৃত্বই পারে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের কল্যাণে নিবেদিত হতে এবং দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করতে। তাদের শাসনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর হবে।
২. সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত সমাজ: বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও মাদকাসক্তি। জামায়াত এসব সামাজিক ব্যাধি নির্মূলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তারা বিশ্বাস করে, ইসলামী মূল্যবোধের প্রসার এবং দুর্নীতির উৎসগুলো বন্ধ করে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। দুর্নীতিকে জাতীয় ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করে এর গভীরে প্রবেশ করে শিকড় উপড়ে ফেলার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে।
৩. ন্যায়বিচার, জনকল্যাণমূলক অর্থনীতি ও পরকালমুখী শিক্ষাব্যবস্থা: জামায়াত এমন একটি ন্যায়বিচারপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায় যেখানে ধনী-গরীব, ক্ষমতাশালী-দুর্বল সকলেই সমান বিচার পাবে। দুর্নীতিমুক্ত বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। তাদের অর্থনৈতিক দর্শন জনকল্যাণমুখী, যেখানে দরিদ্রদের অধিকার এবং সকলের জন্য মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা হবে। অর্থনৈতিক দুর্নীতি বন্ধের মাধ্যমে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করা হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে তারা কেবল দুনিয়াবি জ্ঞানার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখে না, বরং একটি পরকালমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চায় যা শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করবে, যা ভবিষ্যতে দুর্নীতিমুক্ত প্রজন্ম গঠনে সহায়ক হবে।
৪. স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও উম্মাহকেন্দ্রিক ভ্রাতৃত্ববোধ: জামায়াত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চায়, যা জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। পররাষ্ট্র নীতিতেও কোনো রকম আর্থিক দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না। একই সাথে, মুসলিম উম্মাহর সাথে ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার করে আন্তর্জাতিক মুসলিম সংহতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে চায়।
৫. দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূরীকরণে যাকাত ও ওয়াকফভিত্তিক বিকল্প অর্থনীতি: জামায়াত মনে করে, প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সমাজে ধনী-গরীবের বৈষম্য বাড়াচ্ছে। এর বিকল্প হিসেবে তারা যাকাত ও ওয়াকফভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার কথা বলে, যা দারিদ্র্য বিমোচন ও সম্পদ বন্টনে সমতা আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এই ব্যবস্থায় অর্থ পাচার, ব্যাংক লুট বা আর্থিক দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকবে না।
৬. নারী, শিশু, সংখ্যালঘু ও সকল শ্রেণির নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা: ইসলাম সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে। জামায়াত নারী, শিশু, সংখ্যালঘু এবং অন্যান্য সকল শ্রেণির নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা সমুন্নত রাখতে অঙ্গীকারবদ্ধ। তারা সমাজে সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে চায়। সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে কোনো রকম দুর্নীতি বা হয়রানি থাকবে না।
৭. নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক জাগরণ: বর্তমানে গণমাধ্যম ও সংস্কৃতিতে নৈতিক অবক্ষয় লক্ষ্য করা যায়। জামায়াত নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা এবং এমন একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটাতে চায় যা জাতির ইতিবাচক মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যকে ধারণ করবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, তবে অপপ্রচারের মাধ্যমে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা হবে না।
ভোট—দুনিয়া ও আখিরাতে জবাবদিহিতার দায়:
অনেকেই ভোটকে নিছকই একটি দুনিয়াবি, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া মনে করেন। কিন্তু ইসলামে ভোট কেবল একটি নাগরিক অধিকার নয়, এটি একটি সাক্ষ্য (শাহাদাহ)। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: “তোমরা সাক্ষ্যকে গোপন করো না। আর যে তা গোপন করবে, তার অন্তর পাপী হবে।” (সূরা বাকারা. আয়াত: ২৮৩)
এই আয়াত অনুযায়ী, একজন মুসলমানের উচিত সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া এবং অসত্যকে প্রত্যাখ্যান করা। ভোট দেওয়ার মাধ্যমে আমরা আসলে একটি নেতৃত্বের পক্ষে বা বিপক্ষে সাক্ষ্য দিই। যখন আমরা একজন দুর্নীতিবাজ, স্বেচ্ছাচারী বা তাগুতী নেতৃত্বকে ভোট দিই, তখন প্রকারান্তরে আমরা দুর্নীতি ও অন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্য দিই, যা আখিরাতে আমাদের জন্য শাস্তির কারণ হতে পারে। দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বকে ভোট দেওয়া মানে সেই দুর্নীতির অংশীদার হওয়া, যা ব্যক্তিগতভাবে আমাদের আখিরাতের হিসাবকে ভারি করে তুলবে।
একজন ইসলামপ্রিয় নাগরিকের উচিত—তাগুত, দুর্নীতিবাজ বা স্বেচ্ছাচারী নেতৃত্বকে নয়; বরং তাকওয়াবান নেতৃত্বকে ভোট দেওয়া। একজন সৎ, যোগ্য ও আল্লাহভীরু ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া মানে নিজের নৈতিক দায়িত্ব পালন করা এবং আখিরাতের জবাবদিহিতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। যখন একজন ভোটার আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে ভোট দেন, তখন তার ভোটটি কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থাকে না, বরং এটি একটি ইবাদতে পরিণত হয়। এই ভোট একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে একটি ধাপ, যা শুধু দুনিয়াবি জীবনকেই নয়, বরং আখিরাতের জীবনকেও প্রভাবিত করবে।
উপসংহার:
বাংলাদেশ আজ এক গভীর নৈতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে নিপতিত। দুর্নীতি আজ রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে, আইনের শাসনের অভাব, এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য জাতির ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এই সংকটের একমাত্র সমাধান হলো আল্লাহভীরু নেতৃত্ব, ন্যায়ের শাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটি একটি আদর্শিক আন্দোলন—যার ভিত্তি পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ, এবং যার লক্ষ্য ইহকাল-পরকাল উভয়ের কল্যাণ।
তারা এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় যেখানে আল্লাহর আইন সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, এবং যেখানে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, এবং সর্বোপরি দুর্নীতি থাকবে না। এই আদর্শিক দৃঢ়তা, সততা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোসহীন অবস্থান জামায়াতকে অন্যান্য দল থেকে আলাদা করে তোলে।
সুতরাং, ইসলামী নেতৃত্ব, সুশাসন এবং জাতীয় মুক্তির জন্য জামায়াতকে ভোট দেওয়া সময়ের দাবি, ঈমানের দাবি। এটি কেবল একটি ভোট নয়, বরং এটি দুর্নীতিমুক্ত একটি উন্নত, শান্তিপূর্ণ এবং ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এটি দুর্নীতি ও অবিচারের বিরুদ্ধে একটি নীরব বিপ্লব, যা একটি সত্যিকার অর্থে ইসলামী কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করবে।
সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায়—জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়া মানে:
* ইসলাম ও মানবতার পক্ষে ভোট দেওয়া: আল্লাহর নির্দেশিত পথে মানবজাতির কল্যাণ সাধনের অঙ্গীকার।
ন্যায়ের শাসনের জন্য দাঁড়ানো: এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা যেখানে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।
* দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান: একটি পরিষ্কার ও সৎ প্রশাসনের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।
* কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে অংশগ্রহণ: এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিফলিত হবে এবং দুর্নীতি নির্মূল হবে।
আসুন, এই নির্বাচনে আমরা আমাদের ভোটকে একটি পবিত্র আমানত হিসেবে বিবেচনা করি এবং একটি তাকওয়াবান, সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্বকে নির্বাচিত করে নিজেদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথে এগিয়ে আসি। এই ভোট কেবল আমাদের বর্তমানকে নয়, বরং আমাদের আখিরাতকেও প্রভাবিত করবে।
লেখক ও কলামিস্ট
Email: aliosmansefaet@gmail.com

























