হত্যার পরবর্তীদিন অপ্রতিমের আম্মুকে সন্ত্বনাও দেয় ঘাতকরা: পুলিশ

- আপডেট সময় ০৬:৫২:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৪ বার পড়া হয়েছে
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) এক শিক্ষকের ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপ্রতীমের ব্যবহৃত আইফোনটিও উদ্ধার করেছে পুলিশ।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুমিল্লায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান এসব তথ্য জানান।
নিহত অপ্রতীম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—কুমিল্লা নগরীর সানন্দা এলাকার সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫), কোতোয়ালি থানার হাতিগাড়া এলাকার মো. কামরুল হাসান এবং আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সিয়াম (১৯)।
আইফোনকে কেন্দ্র করেই হত্যার পরিকল্পনা
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর কুমিল্লা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতীমকে দেখা যায়। পরে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করে তাকে এক ঘণ্টার জন্য বাইরে যাওয়ার কথা বলে ডেকে নেয় তুহিন।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে তুহিন অপ্রতীমকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের পাশ দিয়ে সানন্দা এলাকার দিকে যায়। পরে ফাহাদ ও কামরুলও ওই এলাকার নির্জন জঙ্গলের দিকে যায়।
পুলিশ জানায়, বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে পাহাড়ঘেরা নির্জন এলাকায় অপ্রতীমের কাছে থাকা আইফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে সে বাধা দিলে তুহিনের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতীমের মাথায় আঘাত করে। একপর্যায়ে তার মৃত্যু হলে আইফোনটি নিয়ে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
হত্যার পরও পরিবারের পাশে থাকা
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পরও তুহিনসহ কয়েকজন অপ্রতীমের পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করে। শনিবার সকালে তুহিন, আনাস ও ফাহিম নামে কয়েকজন অপ্রতীমের বাড়িতে গিয়ে তার শোকাহত মাকে সান্ত্বনা দেয়।
এরপর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের নেতারা তুহিনকে শনাক্ত করেন এবং পরে তাকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে অন্যদেরও গ্রেপ্তার করে। তুহিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তার বাসা থেকে অপ্রতীমের আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
নিখোঁজের পর পাহাড়ি জঙ্গল থেকে মরদেহ উদ্ধার
শুক্রবার বিকেলে বাসা থেকে আইফোন নিয়ে বের হওয়ার পর অপ্রতীম আর ফিরে আসেনি। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান না পেয়ে রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
পরদিন শনিবার দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণে সালমানপুর এলাকার পাহাড়ঘেরা জঙ্গলে স্থানীয় লোকজন ও শিক্ষার্থীরা অপ্রতীমের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
শোকের ছায়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে অপ্রতীমের বাবা-মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। স্বজন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেমে আসে শোকের আবহ।
রোববার সকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে অপ্রতীমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে কোটবাড়ী গন্ধমতি এলাকায় নিজ বাড়ির পাশের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও নিহতের স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয়ে শোক কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এ কারণে স্থগিত রাখা হয়েছে ক্লাস ও পরীক্ষা। নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াই হত্যার উদ্দেশ্য ছিল বলে জানা গেছে। মামলার তদন্ত শেষ করে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি চলছে।



















