সৈকতে গোসলে নেমে তিন পর্যটকের মৃত্যু

- আপডেট সময় ১২:৫৬:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৭ বার পড়া হয়েছে
অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেরাই সাগরের প্রবল স্রোতে ভেসে গেলেন একদল পর্যটক। তাঁদের মধ্যে দুই বন্ধুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে স্রোতে তলিয়ে যাওয়া অন্য দলের এক যুবকেরও মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে কক্সবাজারের রামুর হিমছড়ি সমুদ্রসৈকতে গোসল করতে নেমে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও দুজন। তাঁদের উদ্ধারে তল্লাশি চলছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেল চারটার দিকে হিমছড়ির পেঁচারদ্বীপ জাদুঘরসংলগ্ন সৈকতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত দুজন ঢাকার উত্তরা থেকে বেড়াতে আসা সাত বন্ধুর দলের সদস্য। তাঁরা হলেন আল মাহিবুর ইবনে মোকাররম ওরফে রোহান (২৩) এবং সাইফুল হক জিসান (২৩)। তাঁদের বন্ধু এস এম নাফিজুর রহমান নিবিড় (২৩) এখনো নিখোঁজ। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম থেকে বেড়াতে আসা শ্রমিকদের একটি দলের মো. আকাশ (২০) মারা গেছেন। ওই দলের হারুন (১৭) নিখোঁজ রয়েছেন।
একই দিনে সৈকতের একটি অংশে প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে বিপুল মানুষের সমাগমের মধ্যে হিমছড়িতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পর্যটকের চাপ বাড়লেও কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সৈকতে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর মতো পর্যাপ্ত লাইফগার্ড নেই বলে জানিয়েছেন বেসরকারি লাইফগার্ড প্রতিষ্ঠান সি-সেফের আঞ্চলিক পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ। তাঁর ভাষ্য, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লাল নিশানা ওড়ানো থাকলেও অনেক পর্যটক তা উপেক্ষা করে পানিতে নামছেন।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার উত্তরা থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত বন্ধু ১৮ অক্টোবর রাতে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পরদিন সকালে তাঁরা বান্দরবানে পৌঁছে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখেন। বুধবার দুপুর পৌনে একটার দিকে তাঁরা হিমছড়ি এলাকার ‘শোর নেস্ট বিচ ক্যাম্প’ রিসোর্টে ওঠেন। খাওয়াদাওয়া শেষে বিকেল চারটার দিকে পেঁচারদ্বীপ জাদুঘরসংলগ্ন সমুদ্রে গোসল করতে নামেন।
এ সময় তাঁদের কাছাকাছি চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পাঁচজনের একটি দলও সাগরে ছিল। ওই দলের একজন প্রবল স্রোতে তলিয়ে যেতে থাকলে তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে যান ঢাকার পর্যটকেরা। কিন্তু তাঁদের কেউই সাঁতার জানতেন না। অন্যকে উদ্ধার করতে গিয়ে তাঁরাও স্রোতের কবলে পড়েন। পায়ের নিচ থেকে বালু সরে গেলে তাঁরা পানিতে ভেসে যেতে থাকেন।
এ সময় তাঁদের চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন ও অন্য পর্যটকেরা উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন। স্থানীয় লোকজন ও উপস্থিত পর্যটকেরা ঢাকার সাত বন্ধুর দলের চারজনকে জীবিত উদ্ধার করেন। আল মাহিবুর ইবনে মোকাররম ও সাইফুল হক জিসানকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তাঁদের বন্ধু নিবিড় নিখোঁজ রয়েছেন।
অন্য দলের পাঁচজনের মধ্যে তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ওই দলের মো. আকাশের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। হারুন এখনো নিখোঁজ।
নিখোঁজ নিবিড় ঢাকার উত্তরা এলাকার আজমপুরের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম লাবিবুর রহমান। অন্যদিকে, হারুনের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নজরপুর এলাকায়। তাঁর বাবার নাম কবির আহাম্মদ। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার শেরশাহ জামতলা ব্যাংক কলোনিতে থাকতেন।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান বলেছেন, পর্যটকদের দুটি দল সাগরে গোসল করতে নামলে ঢেউ ও স্রোতে ভেসে যায়। স্থানীয় লোকজন একজনকে জীবিত উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠান। পরে ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ দুজনকে উদ্ধারে তল্লাশি চলছে।
রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে ফজলুল হকও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
পর্যটকের ঢল, নিরাপত্তায় ঘাটতি
কক্সবাজারে পর্যটকের চাপ বাড়লেও সৈকতের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা ও উদ্ধারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেসরকারি লাইফগার্ড প্রতিষ্ঠান সি-সেফের আঞ্চলিক পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ জানিয়েছেন, কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় গোসল করতে নেমে কেউ নিখোঁজ হলে উদ্ধারের জন্য তাঁদের ২৭ জন লাইফগার্ডকর্মী রয়েছেন। কিন্তু কলাতলী থেকে দক্ষিণে দরিয়ানগর, হিমছড়ি, পাটুয়ারটেক, ইনানী হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সৈকতে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর মতো পর্যাপ্ত কর্মী নেই।
ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, দুর্গাপূজার ছুটিতে কক্সবাজারে তিন লাখের বেশি পর্যটকের সমাগম ঘটেছে। বুধবার বিকেলে লাবণী পয়েন্টে বিপুল মানুষের উপস্থিতিতে প্রতিমা বিসর্জন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে ভিড় দেখে অনেকে গোসল করতে দরিয়ানগর ও হিমছড়ির দিকে ছুটছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
তাঁর ভাষ্য, হিমছড়ি-দরিয়ানগরসহ কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টে বর্তমানে অন্তত ২০টি গুপ্তখালের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গুপ্তখালে স্রোত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গোসলে নামতে নিষেধ করে বিভিন্ন স্থানে লাল নিশানা ওড়ানো হলেও অনেক পর্যটক তা মানছেন না।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেছেন, বর্তমানে কক্সবাজারে তিন লাখের বেশি পর্যটক অবস্থান করছেন। পাঁচ শতাধিক হোটেল, গেস্টহাউস, রিসোর্ট ও কটেজের কোনো কক্ষ খালি নেই। পর্যটকের এই বিপুল চাপের মধ্যে সৈকতের বিভিন্ন অংশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালানোর সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।



















