সংগ্রাম, সাফল্য আর ইতিহাস গড়ার এক অনন্য কাহিনী
কিংবদন্তি লিওনেল মেসির জন্মদিন আজ

- আপডেট সময় ১১:৫১:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
- / ১৮৭৯ বার পড়া হয়েছে
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের অবদান সময়ের সীমা ছাড়িয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। সেই তালিকার শীর্ষ সারিতেই রয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। আজ ২৪ জুন, এই জীবন্ত কিংবদন্তির জন্মদিন। ১৯৮৭ সালের এই দিনে আর্জেন্টিনার সান্তা ফে প্রদেশের রোজারিও শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তিনি শুধু একজন খেলোয়াড় নন, বরং আবেগ, ভালোবাসা এবং অনুপ্রেরণার আরেক নাম। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি’অর—ফুটবলের প্রায় সব বড় অর্জনই নিজের করে নিয়েছেন তিনি। জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক বিশ্ব ফুটবলের এই মহানায়কের বর্ণাঢ্য জীবন ও ক্যারিয়ার।
লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে মেসি ছিলেন একটি কারখানার শ্রমিক এবং স্থানীয় ফুটবল দলের কোচ। মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি কাজ করতেন একটি কারখানায়। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল মেসির অদম্য ভালোবাসা।
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি স্থানীয় ক্লাব গ্র্যান্ডোলিতে ফুটবল খেলা শুরু করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার অসাধারণ প্রতিভা সবার নজর কেড়ে নেয়। পরে তিনি আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের যুব দলে যোগ দেন।
মেসির বয়স যখন মাত্র ১০ বছর, তখন তার শরীরে ধরা পড়ে গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি (Growth Hormone Deficiency)। এই রোগের কারণে তার স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছিল।
চিকিৎসার খরচ ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। পরিবার সেই ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছিল। এমন সময় স্পেনের ক্লাব এফসি বার্সেলোনা তার প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয় এবং চিকিৎসার খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দেয়।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে স্পেনে পাড়ি জমান মেসি। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় তার জীবন।
২০০০ সালে বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি লা মাসিয়াতে যোগ দেন মেসি।
২০০৪ সালের ১৬ অক্টোবর, মাত্র ১৭ বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক হয় তার। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
বার্সেলোনার হয়ে ১৭ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি জিতেছেন—
১০টি লা লিগা শিরোপা
৭টি কোপা দেল রে
৮টি স্প্যানিশ সুপার কাপ
৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ
৩টি উয়েফা সুপার কাপ
৩টি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ
বার্সেলোনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবেও নিজের নাম লিখিয়েছেন তিনি।
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হলো লিওনেল মেসি বনাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দুই তারকা বিশ্ব ফুটবল শাসন করেছেন। ব্যালন ডি’অর, গোলসংখ্যা, শিরোপা—সবকিছুতেই ছিল তুমুল প্রতিযোগিতা।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু ফুটবলকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং কোটি কোটি দর্শকের আগ্রহকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ক্লাব ফুটবলে একের পর এক সাফল্য পেলেও জাতীয় দলের হয়ে বড় শিরোপার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে মেসিকে।
২০০৭, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারতে হয় আর্জেন্টিনাকে।
২০১৪ বিশ্বকাপেও ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজয় বরণ করে দলটি।
এই হতাশা এতটাই তীব্র ছিল যে ২০১৬ সালে একবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন মেসি। তবে কোটি ভক্তের অনুরোধে আবার ফিরে আসেন তিনি।
অবশেষে ২০২১ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয় করে আর্জেন্টিনা। এরপর ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে জয় করে ফাইনালিসিমা। কিন্তু সবচেয়ে বড় মুহূর্ত আসে কাতার বিশ্বকাপে।
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয় করে আর্জেন্টিনা। দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে। বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে মেসির সেই ছবি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে।
বিশ্বের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি ব্যালন ডি’অর জিতেছেন রেকর্ড ৮ বার।
এছাড়া তিনি জিতেছেন— ফিফা দ্য বেস্ট, গোল্ডেন বল, ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু। লরিয়াস ওয়ার্ল্ড স্পোর্টসম্যান অব দ্য ইয়ার সহ অসংখ্য ব্যক্তিগত পুরস্কার।
২০২৩ সালে ইউরোপীয় ফুটবলের দীর্ঘ অধ্যায় শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন মেসি।
তার আগমনের পর যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের জনপ্রিয়তা নতুন মাত্রা পায়। স্টেডিয়ামগুলো দর্শকে ভরে ওঠে এবং মেজর লিগ সকার বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনায় আসে।
মাঠে যত বড় তারকা, ব্যক্তিগত জীবনে ততটাই বিনয়ী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ মেসি। শৈশবের বন্ধু আন্তোনেলা রোকুজ্জোকে বিয়ে করেছেন তিনি। তাদের তিন সন্তান—থিয়াগো, মাতেও ও সিরো। পরিবারকে সবসময় নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি বলে উল্লেখ করেন মেসি।
মেসির ফুটবলীয় দক্ষতা শুধু গোল করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার অসাধারণ ড্রিবলিং, নিখুঁত পাসিং, অবিশ্বাস্য ভিশন, ফ্রি-কিক দক্ষতা, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অনন্য। সব মিলিয়ে তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম পূর্ণাঙ্গ খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত।
একজন ক্ষুদে বালক থেকে বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়ে ওঠার গল্পটি শুধু সাফল্যের নয়, বরং সংগ্রাম, ধৈর্য এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প।
৩৯ বছরে পা দিয়েও (২০২৬ অনুযায়ী) তিনি এখনও বিশ্ব ফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তার নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও বিস্ময়ের সঙ্গে।
আজ তার জন্মদিনে বিশ্বের কোটি কোটি ভক্তের একটাই শুভেচ্ছা— “শুভ জন্মদিন, ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসি।”




















