শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলমানদের অবিস্মরণীয় অবদান

- আপডেট সময় ১০:২১:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
- / ৩১১ বার পড়া হয়েছে
আলী ওসমান শেফায়েত
“ইকরা”—পড়ুন। হেরা গুহায় জিব্রাইল (আ.)-এর মাধ্যমে উচ্চারিত এই একটি শব্দই ছিল ইসলামের প্রথম নির্দেশ এবং আগামীর বিশ্বসভ্যতার মূলমন্ত্র। ইসলাম কেবল একটি ধর্ম হিসেবে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপ্লব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। শিক্ষার এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুসলিমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় এমন ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিল, যা বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ। জন উইলিয়াম ড্র্যাপার, জর্জ সার্টন এবং ফিলিপ কে. হিট্টির মতো প্রথিতযশা ঐতিহাসিকরা একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, মুসলিম আরবরা কেবল প্রাচীন গ্রিক বা ভারতীয় জ্ঞানকে সংরক্ষণই করেনি, বরং সেগুলোকে সমৃদ্ধ করে আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে।
ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে শিক্ষা দর্শন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভূমিকা:
ইসলামের শিক্ষা বিস্তারের মহান কারিগর ছিলেন স্বয়ং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারী না হলেও ওহির জ্ঞানে ছিলেন মহাজ্ঞানী।
দারুল আরকাম ও সুফফা: মক্কায় চরম প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি ‘দারুল আরকাম’ প্রতিষ্ঠা করেন। মদিনায় হিজরতের পর মসজিদে নববীর বারান্দায় প্রতিষ্ঠিত ‘সুফফা’ ছিল ইসলামের প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়।
বদর যুদ্ধের অভিনভ মুক্তিপণ: বদর যুদ্ধে শিক্ষিত বন্দিদের জন্য শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, তারা ১০ জন মুসলিম শিশুকে অক্ষরজ্ঞান দান করলে মুক্তি পাবে। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধের ময়দানে শিক্ষা বিস্তারের এক অনন্য উদাহরণ।
নারী শিক্ষা: রাসূল (সা.)-এর পবিত্র স্ত্রীগণ, বিশেষ করে হযরত আয়েশা (রা.), ছিলেন নারী শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। তাঁর গৃহটি তৎকালীন সময়ে নারীদের উচ্চশিক্ষা ও ফিকহ চর্চার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
খোলাফায়ে রাশেদীন ও উমাইয়া যুগের প্রাতিষ্ঠানিক ধারা:
রাসূল (সা.) প্রতিষ্ঠিত শিক্ষার বুনিয়াদ খোলাফায়ে রাশেদার সময়ে ব্যাপক রূপ লাভ করে। হযরত ওমর (রা.) প্রথম শিক্ষাবিস্তারের প্রাতিষ্ঠানিক ধারা প্রবর্তন করেন। তিনি খিলাফতের বিভিন্ন এলাকায় মক্তব ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং বায়তুল মাল থেকে শিক্ষকদের বেতন নিশ্চিত করেন। এমনকি যাযাবর বেদুইনদের জন্যও শিক্ষক নিয়োগ করেছিলেন।
উমাইয়া যুগে স্পেনের কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় (৭৮৮ খ্রি.) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে এক মাইলফলক। খলিফা ওমর বিন আব্দুল আজিজের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে হাদিস সংকলনের মাধ্যমে গবেষণার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়।
আব্বাসীয় যুগে প্রাতিষ্ঠানিক ধারা:
মুসলিম জাতির শিক্ষাবিস্তারের স্বর্ণযুগ নির্মাতা হলো আব্বাসীয় রাজবংশ। খলিফা আল-মামুন ৮৩০ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে ‘বায়তুল হিকমাহ’ (House of Wisdom) প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল একাধারে পাঠাগার, অনুবাদ কেন্দ্র এবং গবেষণা একাডেমি।
এখানে গ্রিক, পারসিক ও সংস্কৃত গ্রন্থসমূহ আরবিতে অনূদিত হয়। এর ফলে প্লেটো, অ্যারিস্টটল এবং ইউক্লিডের জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়। আব্বাসীয়রাই প্রথম বাগদাদে কাগজের কল স্থাপন করে বইকে সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসেন।
আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মুসলিম মনীষীদের আবিষ্কার:
আধুনিক বিজ্ঞান তার অস্তিত্বের জন্য মুসলিম বিজ্ঞানীদের কাছে চিরঋণী। নিচে প্রধান কয়েকটি শাখার অবদান তুলে ধরা হলো:
ক. চিকিৎসা বিজ্ঞান:
ইবনে সিনা (Avicenna) ছিলেন চিকিৎসা জগতের সম্রাট। তাঁর রচিত ‘আল-কানুন ফিত-তিব্ব’ (The Canon of Medicine) ১৭শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রধান পাঠ্য ছিল। মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাজি প্রথম গুটিবসন্ত ও হামের পার্থক্য নিরূপণ করেন এবং কৃত্রিম উপায়ে বরফ তৈরি করে বিশ্বকে অবাক করে দেন।
খ. গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা:
আল-খাওয়ারিজমি ছিলেন বীজগণিতের (Algebra) জনক। তাঁর ‘আল-জবর’ গ্রন্থ থেকেই ‘অ্যালজেব্রা’ শব্দের উৎপত্তি। তিনিই প্রথম শূন্যের (Zero) ব্যবহারকে জনপ্রিয় করেন। আল-বাত্তানি ও আল-বিরুনি পৃথিবীর পরিধি ও ব্যাস নির্ভুলভাবে নির্ণয় করেন। ওমর খৈয়াম পঞ্জিকা সংস্কার করে সৌরবছরের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করেন।
গ. রসায়ন ও পদার্থবিদ্যা:
জাবের ইবনে হাইয়ান ছিলেন আধুনিক রসায়নের জনক। তিনি পাতন, ঊর্ধ্বপাতন, ভস্মীকরণ ও গলানোর মতো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তিনি ইস্পাত তৈরির প্রণালী এবং লোহার মরিচা রোধক বার্নিশ আবিষ্কার করেছিলেন। পদার্থবিদ্যায় ইবনুল হাইসাম আলোকবিজ্ঞানের (Optics) ভিত্তি স্থাপন করেন এবং ক্যামেরার পূর্বসূরি ‘পিনহোল ক্যামেরা’র ধারণা দেন।
ঘ. শল্যচিকিৎসা বা সার্জারি:
আবুল কাসেম আল-জাহরাবি (Albucasis) ছিলেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম শল্যচিকিৎসক। তিনি নাকের ওষুধ দেওয়ার যন্ত্র, দাঁত পরিষ্কারের যন্ত্র এবং জরায়ুর অস্ত্রোপচারের জন্য বিশেষ কাঁচি আবিষ্কার করেন। তাঁর উদ্ভাবিত ২০০টিরও বেশি চিকিৎসা যন্ত্র আজও আধুনিক সার্জারিতে ব্যবহৃত হয়।
ইউরোপে মুসলিম শিক্ষার অনুপ্রবেশ ও বিস্তার:
আরব থেকে মুসলিম শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রধানত সিসিলি ও স্পেনের মাধ্যমে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। স্পেনের কর্ডোভা, সেভিল ও গ্রানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল আধুনিক ইউরোপীয় রেনেসাঁর সূতিকাগার। সিসিলির রাজা রজার দ্বিতীয় এবং ফ্রেডরিক দ্বিতীয় আরবের শিক্ষা সংস্কৃতিকে আল্পস পর্বতমালা পার করে ইউরোপের কেন্দ্রে নিয়ে যান।
জেরার্ড অব ক্রেমোনা, অ্যাডেলার্ড অব বাথ এবং মাইকেল স্কটের মতো অনুবাদকরা আরবি গ্রন্থগুলো ল্যাটিন ও হিব্রু ভাষায় অনুবাদ করে ইউরোপের মানুষের কাছে বিজ্ঞানের দুয়ার খুলে দেন। বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়—আল-কারাউইয়িন (University of Al Quaraouiyine)—৮৫৯ সালে মরক্কোর ফেজে প্রতিষ্ঠিত হয় এক মুসলিম নারী ফাতেমা আল-ফিরহির হাতে, যা আজও সক্রিয়।
বাংলার মুসলিম শিক্ষাবিদ ও রেনেসাঁ:
উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলায় মুসলিম সমাজ যখন ব্রিটিশ শাসনে ও সাম্প্রদায়িক চাপে পিছিয়ে পড়ছিল, তখন বেশ কিছু বিপ্লবী মনীষী শিক্ষার মশাল হাতে এগিয়ে আসেন:
হাজী মোহাম্মদ মুহসীন (১৭১৯-১৮১২): বাংলার মুসলিম শিক্ষার ইতিহাসে তিনি এক কিংবদন্তি। তাঁর বিশাল সম্পত্তি তিনি শিক্ষার জন্য ওয়াকফ করে যান। হুগলি মহসিন কলেজসহ বহু মাদ্রাসার পেছনে তাঁর আর্থিক অবদানই ছিল মূল ভিত্তি।
নবাব বাহাদুর আব্দুল লতিফ (১৮২৮-১৮৯৩): ১৮৬৩ সালে ‘মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি মুসলিম যুবকদের আধুনিক ইংরেজি শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, আধুনিক যুগোপযোগী শিক্ষা ছাড়া মুসলমানরা মর্যাদাবান হতে পারবে না।
মাওলানা আবু নাসার মোহাম্মদ ওয়াহেদ (১৮৭৩-১৯৫০): তিনি মাদ্রাসা শিক্ষায় আধুনিক বিষয় যেমন—ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করে ‘নিউ স্কিম মাদ্রাসা’ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। এটি প্রথাগত ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়েছিল।
স্থাপত্য, ভূগোল ও সমাজবিজ্ঞান:
মুসলিমদের অবদান কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ ছিল না। স্থাপত্যশৈলীতে আগ্রার তাজমহল, কর্ডোভার জামে মসজিদ এবং গ্রানাডার আলহাম্রা প্রাসাদ আজও প্রকৌশলবিদ্যার বিস্ময়।
সমাজবিজ্ঞানের জনক হিসেবে খ্যাত ইবনে খালদুন তাঁর ‘আল-মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে ইতিহাস দর্শনের যে সূত্র দিয়েছেন, তা আধুনিক সমাজতত্ত্বের ভিত্তি। ভূগোলে আল-ইদ্রিসি প্রথম বিশ্বমানচিত্র অঙ্কন করেন, যা দীর্ঘকাল নাবিকদের পথ দেখিয়েছে।
বর্তমান সংকট ও উত্তরণের পথ:
আজকের দুনিয়া ইসলামকে অনেক সময় পিছিয়ে পড়া জাতি হিসেবে চিহ্নিত করে। এর মূল কারণ বর্তমান মুসলিমরা তাদের পূর্বপুরুষদের জ্ঞানতাত্ত্বিক উত্তরাধিকার হারিয়ে ফেলেছে। সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলিম শিক্ষা ব্যবস্থাকে ‘ধর্মীয়’ ও ‘সাধারণ’—এই দুই ধারায় বিভক্ত করে জাতিগত ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের কল্যাণে যে জ্ঞানই উপকারী, সবই ইসলামী শিক্ষা। ইবনে রুশদ, ইমাম গাজ্জালি বা ইবনে সিনার কাছে বিজ্ঞান ও ধর্ম আলাদা ছিল না।
উপসংহার:
মুসলিম সভ্যতার ইতিহাস কেবল যুদ্ধের ইতিহাস নয়, এটি ছিল মূলত কলম ও কালির বিজয়গাথা। মুসলিম মনীষীরা না থাকলে গ্রিক সভ্যতা হারিয়ে যেত এবং আধুনিক বিজ্ঞানের জয়যাত্রা বহু শতাব্দী পিছিয়ে পড়ত। আধুনিক কৃষি পদ্ধতি (যা আবু জাকারিয়া তাঁর ‘কিতাব আল-ফলাহাত’-এ লিখে গেছেন) থেকে শুরু করে পেন্ডুলামের দোলন (ইবনে ইউনুস উদ্ভাবিত)—সবই মুসলিম মেধার স্বাক্ষর।
মুসলিমদের হারানো গৌরব ফিরে পেতে হলে আবার সেই ‘ইকরা’র মূলমন্ত্রে ফিরে যেতে হবে। বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য আর প্রযুক্তির চর্চাকে ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ইতিহাস পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, সারা বিশ্ব আজ মুসলমানদের কাছে ঋণী। নিজেদের মর্যাদা পুনরুদ্ধারে আমাদের পূর্বসূরিদের জ্ঞানসাধনার পথই একমাত্র পাথেয়। আল্লাহ আমাদের সেই তৌফিক দান করুন। আমীন।
লেখক ও কলামিস্ট




















