কক্সবাজার ১১:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাহাড় ধ্বসে ৯ জনের মৃত্যু, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৮ শহরে ১

নিজস্ব সংবাদদাতা :
  • আপডেট সময় ০৭:৩৬:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
  • / ১৯৪ বার পড়া হয়েছে

বর্ষা এলেই কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা জনপদ, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোতে নেমে আসে আতঙ্কের ছায়া; যা অনেক সময় রূপ নেয় নির্মম মৃত্যুফাঁদে। কক্সবাজারের পাহাড়গুলো যেন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে নীরব ঘাতকে। বর্ষা নামলেই এসব এলাকায় শুরু হয় অনিবার্য আতঙ্কের ঘনঘটা। সম্প্রতি রবিবার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জেলার পৃথক চারটি স্থানে ভয়াবহ পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। অতিবৃষ্টির কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্প, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি আর শহরতলির ঢালু ভূমি তখন হয়ে ওঠে চরম অস্থিতিশীল।

 

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ১৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই অতিভারী বর্ষণ হচ্ছে। সমুদ্র অত্যন্ত উত্তাল থাকায় কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে ওড়ানো হয়েছে লাল পতাকা। পর্যটকদের সমুদ্রে নামার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে এবং হাঁটু পানির বেশি গভীরে না যাওয়ার জন্য লাইফগার্ড কর্মীরা নিরলসভাবে মাইকিং করে যাচ্ছেন।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মৃত্যুগুলো কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, পাহাড় ধ্বংস, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণ এবং কার্যকর পুনর্বাসনের অভাবেরই এক নির্মম পরিণতি। অতিবৃষ্টির অভিঘাতে মাটি আলগা হয়ে ঢাল ভেঙে পড়ে, আর সেই ধসের নিচে চাপা পড়ে যায় মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও নিরাপত্তা। চলতি মৌসুমের সাম্প্রতিক এই বিপর্যয় সেই ভয়াবহ বাস্তবকাকেই আবার নগ্নভাবে সামনে এনেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এখন কক্সবাজারের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। পাহাড়ের গায়ে লাগাতার বৃষ্টির চাপ বাড়লে মাটির ধারণক্ষমতা কমে যায়। তখনই পাহাড়ের বিশাল অংশ ভেঙে নিচে নেমে আসে, যার নিচে চাপা পড়ে ঘটে প্রাণহানি।

 

১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্প: প্রথম পাহাড়ধসের ঘটনাটি ঘটে রোববার রাত আনুমানিক ১টার দিকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। প্রবল বর্ষণে পাহাড়ের মাটি ধসে একটি ঘরের ওপর পড়লে একই পরিবারের তিনজন নিহত হন। নিহতরা হলেন—মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাদের চার বছরের শিশু সন্তান মোহাম্মদ আনাস। উখিয়া ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করে। একই ঘটনায় আহত দুজনকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প: এর কিছুক্ষণ পর রাত পৌনে ২টার দিকে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা কাদামাটির নিচে চাপা পড়ে একরাম (৭) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও ক্যাম্পবাসীরা শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত তার প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প: রাত ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরেকটি ভয়াবহ পাহাড়ধস ঘটে। এতে উম্মে হাবিবা (২৭), তার বোন তানজিনা আক্তার (১৩) এবং দুই শিশু রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩) নিহত হয়। এই ঘটনায় আহত হন আরও একজন।

শহরতলির ছাত্তারঘোনা এলাকা: একই রাতে কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে চাপা পড়ে একটি পরিবার। স্থানীয়দের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে আলী আকবর নামের এক ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।

সংকটের নেপথ্যে: পুনর্বাসন ও জলবায়ু পরিবর্তন

কক্সবাজারে পাহাড়ধস কোনো নতুন ঘটনা নয়। প্রতি বর্ষা মৌসুমে প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ পাহাড়সংলগ্ন বসতিগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কতা জারি করে। কিন্তু বাস্তবে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ ছাড়তে পারেন না অধিকাংশ মানুষ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব মানুষের বড় অংশই নিম্ন আয়ের। বিকল্প আবাসনের কোনো সুযোগ না থাকায় জীবনের ঝুঁকি জেনেও তারা পাহাড়ঘেরা এলাকাতেই বসবাস করতে বাধ্য হন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই। বিপুল সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীকে জায়গা দিতে গিয়ে বহু পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ করা হয়েছে, যার ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক কাঠামো মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

পরিবেশবিদদের মন্তব্য: “গত দুই দশকে কক্সবাজারে ব্যাপকভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে। কোথাও আবাসন প্রকল্প, কোথাও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আবার কোথাও সড়ক নির্মাণের জন্য পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন পরিবর্তন করা হয়েছে। পাহাড়ের ঢাল কেটে বসতি নির্মাণ করায় বৃষ্টির সময় মাটি ধরে রাখার প্রাকৃতিক শক্তি হারিয়ে যায়। সেই সঙ্গে নির্বিচারে বৃক্ষনিধনের ফলে পাহাড়ের মাটি বেঁধে রাখার শিকড়ও আজ বিলুপ্ত। পাহাড়কে যতটা প্রাকৃতিকভাবে রেখে দেওয়া দরকার ছিল, বাস্তবে হয়েছে তার উল্টোটা।”

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে। আগে কয়েক দিনে যে পরিমাণ বৃষ্টি হতো, এখন অনেক সময় মাত্র কয়েক ঘণ্টাতেই সেই পরিমাণ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ফলে পাহাড়ের ওপর হঠাৎ তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়। মাটির অভ্যন্তরে পানির পরিমাণ বেড়ে গেলে পাহাড়ের স্তরগুলো আলগা হয়ে পড়ে এবং ধস নেমে আসে। আগামী কয়েক দিন কক্সবাজার অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে বিধায় নতুন করে পাহাড়ধসের ঝুঁকি উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।

 

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ: মান্নান বলেন, “ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে অনবরত মাইকিং করা হচ্ছে এবং সবাইকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যেই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকদেরও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে।”

এদিকে, নতুন করে আকাশ মেঘলা হয়ে বৃষ্টি শুরু হলেই আতঙ্কে দিন কাটছে পাহাড়ঘেরা এলাকার বাসিন্দাদের। অনেকেই ঘরে ঘুমাতে না পেরে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। কেউ কেউ স্বজনদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ—বছরের পর বছর ঝুঁকির কথা বলা হলেও, এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য কোনো দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে সামনে আরও বড় বিপদের আশঙ্কা দিন দিন তীব্র হচ্ছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

পাহাড় ধ্বসে ৯ জনের মৃত্যু, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৮ শহরে ১

আপডেট সময় ০৭:৩৬:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬

বর্ষা এলেই কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা জনপদ, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোতে নেমে আসে আতঙ্কের ছায়া; যা অনেক সময় রূপ নেয় নির্মম মৃত্যুফাঁদে। কক্সবাজারের পাহাড়গুলো যেন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে নীরব ঘাতকে। বর্ষা নামলেই এসব এলাকায় শুরু হয় অনিবার্য আতঙ্কের ঘনঘটা। সম্প্রতি রবিবার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জেলার পৃথক চারটি স্থানে ভয়াবহ পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। অতিবৃষ্টির কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্প, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি আর শহরতলির ঢালু ভূমি তখন হয়ে ওঠে চরম অস্থিতিশীল।

 

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ১৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই অতিভারী বর্ষণ হচ্ছে। সমুদ্র অত্যন্ত উত্তাল থাকায় কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে ওড়ানো হয়েছে লাল পতাকা। পর্যটকদের সমুদ্রে নামার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে এবং হাঁটু পানির বেশি গভীরে না যাওয়ার জন্য লাইফগার্ড কর্মীরা নিরলসভাবে মাইকিং করে যাচ্ছেন।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মৃত্যুগুলো কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, পাহাড় ধ্বংস, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণ এবং কার্যকর পুনর্বাসনের অভাবেরই এক নির্মম পরিণতি। অতিবৃষ্টির অভিঘাতে মাটি আলগা হয়ে ঢাল ভেঙে পড়ে, আর সেই ধসের নিচে চাপা পড়ে যায় মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও নিরাপত্তা। চলতি মৌসুমের সাম্প্রতিক এই বিপর্যয় সেই ভয়াবহ বাস্তবকাকেই আবার নগ্নভাবে সামনে এনেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এখন কক্সবাজারের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। পাহাড়ের গায়ে লাগাতার বৃষ্টির চাপ বাড়লে মাটির ধারণক্ষমতা কমে যায়। তখনই পাহাড়ের বিশাল অংশ ভেঙে নিচে নেমে আসে, যার নিচে চাপা পড়ে ঘটে প্রাণহানি।

 

১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্প: প্রথম পাহাড়ধসের ঘটনাটি ঘটে রোববার রাত আনুমানিক ১টার দিকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। প্রবল বর্ষণে পাহাড়ের মাটি ধসে একটি ঘরের ওপর পড়লে একই পরিবারের তিনজন নিহত হন। নিহতরা হলেন—মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাদের চার বছরের শিশু সন্তান মোহাম্মদ আনাস। উখিয়া ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করে। একই ঘটনায় আহত দুজনকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প: এর কিছুক্ষণ পর রাত পৌনে ২টার দিকে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসা কাদামাটির নিচে চাপা পড়ে একরাম (৭) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও ক্যাম্পবাসীরা শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত তার প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প: রাত ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আরেকটি ভয়াবহ পাহাড়ধস ঘটে। এতে উম্মে হাবিবা (২৭), তার বোন তানজিনা আক্তার (১৩) এবং দুই শিশু রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩) নিহত হয়। এই ঘটনায় আহত হন আরও একজন।

শহরতলির ছাত্তারঘোনা এলাকা: একই রাতে কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে চাপা পড়ে একটি পরিবার। স্থানীয়দের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে আলী আকবর নামের এক ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।

সংকটের নেপথ্যে: পুনর্বাসন ও জলবায়ু পরিবর্তন

কক্সবাজারে পাহাড়ধস কোনো নতুন ঘটনা নয়। প্রতি বর্ষা মৌসুমে প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ পাহাড়সংলগ্ন বসতিগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কতা জারি করে। কিন্তু বাস্তবে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ ছাড়তে পারেন না অধিকাংশ মানুষ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব মানুষের বড় অংশই নিম্ন আয়ের। বিকল্প আবাসনের কোনো সুযোগ না থাকায় জীবনের ঝুঁকি জেনেও তারা পাহাড়ঘেরা এলাকাতেই বসবাস করতে বাধ্য হন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই। বিপুল সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীকে জায়গা দিতে গিয়ে বহু পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ করা হয়েছে, যার ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক কাঠামো মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

পরিবেশবিদদের মন্তব্য: “গত দুই দশকে কক্সবাজারে ব্যাপকভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে। কোথাও আবাসন প্রকল্প, কোথাও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আবার কোথাও সড়ক নির্মাণের জন্য পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন পরিবর্তন করা হয়েছে। পাহাড়ের ঢাল কেটে বসতি নির্মাণ করায় বৃষ্টির সময় মাটি ধরে রাখার প্রাকৃতিক শক্তি হারিয়ে যায়। সেই সঙ্গে নির্বিচারে বৃক্ষনিধনের ফলে পাহাড়ের মাটি বেঁধে রাখার শিকড়ও আজ বিলুপ্ত। পাহাড়কে যতটা প্রাকৃতিকভাবে রেখে দেওয়া দরকার ছিল, বাস্তবে হয়েছে তার উল্টোটা।”

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে। আগে কয়েক দিনে যে পরিমাণ বৃষ্টি হতো, এখন অনেক সময় মাত্র কয়েক ঘণ্টাতেই সেই পরিমাণ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ফলে পাহাড়ের ওপর হঠাৎ তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়। মাটির অভ্যন্তরে পানির পরিমাণ বেড়ে গেলে পাহাড়ের স্তরগুলো আলগা হয়ে পড়ে এবং ধস নেমে আসে। আগামী কয়েক দিন কক্সবাজার অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে বিধায় নতুন করে পাহাড়ধসের ঝুঁকি উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।

 

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ: মান্নান বলেন, “ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে অনবরত মাইকিং করা হচ্ছে এবং সবাইকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যেই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকদেরও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে।”

এদিকে, নতুন করে আকাশ মেঘলা হয়ে বৃষ্টি শুরু হলেই আতঙ্কে দিন কাটছে পাহাড়ঘেরা এলাকার বাসিন্দাদের। অনেকেই ঘরে ঘুমাতে না পেরে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। কেউ কেউ স্বজনদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ—বছরের পর বছর ঝুঁকির কথা বলা হলেও, এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য কোনো দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে সামনে আরও বড় বিপদের আশঙ্কা দিন দিন তীব্র হচ্ছে।